পেছন ফিরে দেখা – বাংলাদেশ ক্রিকেটের যেমন কেটেছে ২০০৮ : উত্তরণ ও আক্ষেপের গল্প

দেখতে দেখতে কেটে গেল আরেকটি বছর। প্রত্যাশা বনাম প্রাপ্তি কিংবা সময় বনাম উন্নতির বিবেচনায় হিসাব কষলে করলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অগ্রগতি পরিমাপ করা বরাবরের মতই দুঃসাধ্য কাজগুলোর একটি। কিন্তু ক্রিকেট যেখানে বাংলাদেশের, যেখানে জয়-পরাজয়টা এখনো মুখ্য বিষয় নয়, সেখানে বিবেচনায় রাখতে হয় আরো অনেক কিছুই।

২০০৮ সাল ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ক্রান্তিলগ্নের একটি বছর। ২০০৭ বিশ্বকাপের পর থেকেই বাংলাদেশ দলের সিনিয়র কিছু খেলোয়াড়ের ফর্মহীনতা, তরুণ মোহাম্মদ আশরাফুল ও মাশয়ারফি বিন মর্তুজার যথাক্রমে জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব ও সহঅধিনায়কত্ব লাভ, কোচ ডেভ হোয়া্টমোরের বিদায়, নতুন নির্বাচক কমিটি- সব কিছু মিলিয়েই কেমন যেন ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। সুদীর্ঘ ছয় মাস কোচহীন থাকার কারণে আরো বিবর্ণ হয়ে পড়ে দলটি। বিবর্ণ এই পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের সর্বশেষ একদিনের ম্যাচে বাংলাদেশের করা ৯৩ রান যখন ব্রেন্ডান ম্যাককালামের তাণ্ডবে মাত্র ছয় ওভারেই টপকে যায় নিউজিল্যান্ড, ভাঙ্গনের একটা সুর তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে সুরের কম্পনে স্বাভাবিক কারণেই ডানেডিনে বাংলাদেশের ২০০৮ এর শুরুটা ছিল দোদুল্যমান। এরপর বড় বড় দলের বিরুদ্ধে টানা পরাজয়ের মধ্যে থাকায় নড়েবড়ে হয়ে পড়ে দলের স্পিরিট ও আত্মবিশ্বাস। হতাশার আবর্তে ক্রমশ তলিয়ে যাওয়া দল যখন মুক্তির কোন পথ খুঁজছিল, তখনি আবার বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত বাংলাদেশের ১৪ ক্রিকেটার সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বে নাম লেখায় ভারতের বিদ্রোহী লিগ আইসিএলে, যার মধ্যে বিসিবির চুক্তিভুক্ত ছয় ক্রিকে্টারও ছিলেন। ভাঙ্গনের ষোলকলা পূর্ণ হয়ে সুড়ঙ্গের শেষ আলোকরেখাটিও যেই মিলিয়ে যাবার উপক্রম হল, তখনি ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম একদিনের ম্যাচে বল হাতে জ্বলে ওঠলেন পেস বোলার মাশারাফি বিন মর্তুজা। প্রথমেই তিন উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডের টপ অর্ডারকে ধসিয়ে দিয়ে মাশরাফি নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে নয়, চারদিকের অসহ্য ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ প্রতিকূল পরিস্থিতির দিকেই চিৎকার করে ঠিক যেন বলতে চাচ্ছিলেন “আর নয়…”। সেই সঙ্গে সুর মেলালেন দলের আর সবাই। কেটে গেল ভাঙ্গনের সুর। মাশরাফির গর্জনে উজ্জীবীত দল ফিরে পেল পূর্বের সেই সঞ্জীবনী শক্তি। বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটল ক্রান্তিকাল থেকে। ‘নিজেকেই নিজের কাছে অচেনা’র মত পরিস্থিতি নিয়ে শুরু হয়েছিল বছরের, আর সেই বছরেরই কিনা শেষটা হল ক্রিকেটে বাংলাদেশের যম হিসেবে পরিচিত শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসে ৪১৩ রান করার মাধ্যমে। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় নয়, তীরে এসে তরী ডুবার মত তিনটি টেস্ট ম্যাচ নয়, লড়তে লড়তে হেরে যাওয়া কিছু একদিনের ম্যাচ নয়, ব্যাক্তিগত পারফর্ম্যান্সের কিছু খণ্ডচিত্র নয়, নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেরাই লড়াই করে নিজেদের স্বমূর্তিতে আবিষ্কার করাকেই আমি বলব ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্জন।

নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জয়।

দলগত প্রাপ্তির কথা বিবেচনা করলে সবার প্রথমেই ভেসে ওঠে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সাত উইকেটে জয়ের কথা। মাশরাফি মর্তুজা ও আব্দুর রাজ্জাকের গড়ে দেয়া ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে জুনায়েদ-মুশফিক-আশরাফুল সেদিন যেভাবে ২০১ রান তাড়া করেছিলেন, তাতে আরেকবার প্রমাণিত হয় যে নিজেদের সেরা খেলাটা খেলতে পারলে যেকোন দলকে যেকোন দিনই হারিয়ে দিয়ে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হল, নিজেদের সেরা খেলাটার বড়ই আকাল এই বাংলাদেশ দলে।

দলগত প্রাপ্তির খাতায় আরো আছে চারটি একদিনের ম্যাচে জয়, যার তিনটি এসেছে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর একটি এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে। প্রদর্শনী করে বেড়াবার মত কোন সাফল্য অবশ্যই নয়, কিন্তু এই বিজয়গুলো দুঃসময়ের দিনগুলোতে আশার শেষ প্রদীপটি জ্বালিয়ে রাখতে একটু হলেও সাহায্য করেছে, একটু হলেও খোরাক যুগিয়েছে আমাদের আত্মবিশ্বাসের ক্ষয়িষ্ণু ভাণ্ডারে।

দলগত প্রাপ্তির বাকী সবগুলোই অবশ্য একই ধরণের। ‘আহা…’, ‘ইস…’, ‘একটুর জন্য…’-এককথায় আক্ষেপ আর দীর্ঘনিশ্বাস। শাহাদাত হোসেনের ২৭ রানে ৬ উইকেট এর কল্যাণে দক্ষিণ আফ্রিকাকে দেশের মাটিতে প্রথম টেস্টে ১৭০ রানে অল আউট করে যখন বাংলাদেশ ২২ রানের লিড তুলে নেয়, তখন স্বপ্ন অঙ্কুরিত হয়েছিল দ্বিতীয় ইনিংসে ভাল একটা স্কোর করে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে দুর্লঙ্ঘ্য একটা টার্গেট বেঁধে দেয়ার। কিন্তু পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। বিজয়ের গুঞ্জন রয়ে গেছে গুঞ্জন হয়ে। পাকিস্তান সফরের তৃতীয় একদিনের ম্যাচে তামিম, আফতাব আর শাকিবের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে পাকিস্তানের ৩০৮ রানও ছুয়েঁ ফেলা সম্ভব মনে হচ্ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ৩০৮ অধরাই থেকে যায়। ২৭ রানে হেরে যায় বাংলাদেশ, আর আশাভঙ্গের বিষে নীল হন ক্রিকেটানুরাগীরা। অলক কাপালির ঝরো সেঞ্চুরি আর দলীয় ১৪ রানের মাথায় শাহাদাত রোহিত শর্মাকে বোল্ড করার পর ভারতের বিরুদ্ধে জয়ের যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল, ফরহাদ রেজা আর মাহমুদউল্লাহর হাত থেকে ক্যাচ ফসকানোর সাথে সাথে সে আশাও ফসকে যায়। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে দুশ রানের নিচে বেঁধে ফেলার পর তামিমের দুর্দান্ত হাফ সেঞ্চুরি কিছু একটার ইঙ্গিত দিচ্ছিল, কিন্তু শাকিব আর তামিম আউট হওয়ার পর সেই কিছু থেকে যায় কিছুতেই। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ২১২ রানে নিউজিল্যান্ডকে আটকে রাখার পর যখন সিরিজ জয়কে খুবি সম্ভব মনে হচ্ছিল, তখনি হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পরে সম্ভবকে অসম্ভব করে তোলেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। চট্টগ্রামে প্রথম টেস্টে এই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধেই ৩১৬ রান ডিফেন্ড করার ব্যর্থতায় রচিত হয় দীর্ঘনিঃশ্বাসের সবচেয়ে বড় মহাকাব্যটি। আর বছরের শেষ দিনে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ৫২১ রানের টার্গেট তাড়া করে গন্তব্য থেকে মাত্র ১২৭ দূরে দাঁড়িয়ে শাকিব আর মুশফিক যখন অবিশ্বাস্য স্বপ্নের হাতছানিটাকে ক্রমেই আলোকোজ্জল করে তুলছিলেন, তখনি হঠাৎ বেঁকে বসে অদৃষ্ট। বাংলাদেশ শেষ চারটি উইকেট হারায় ১১ রানে। পরাজিতদের ইতিহাস নাকি মনে রাখে না, কেননা বিজয়ীরাই হল ইতিহাসের রচয়িতা। পরাজিত বলে আমাদের আক্ষেপের গল্প আর দীর্ঘনিশ্বাসের বেদনা ইতিহাস মনে না রাখলে না রাখুক, আমরা নিজেরাই যদি নিজেদের আক্ষেপের কথা মনে রেখে শিক্ষা নিতে পারি, তাহলে সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন বিজয়ীর আসনে বসে বাংলাদেশের ক্রিকেটই ইতিহাস রচনা করবে।

ব্যক্তিগত সাফল্য বিবেচনা করলে সবার আগেই বলেতে হয় অলরাউন্ডার শাকিব আল হাসানের কথা। বিশ্বকাপের পর শাকিবও নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সাঁতার কাটতে কাটতে শেষে ঘরের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় একদিনের ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরির মধ্য দিয়ে পুনঃআবিষ্কার করেন নিজেকে। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বছর শেষে আল হাসানের পরিসংখ্যানটাই কথা বলুকঃ ১৯ টি ওয়ান ডে ম্যাচে ২৪ গড়ে একটি সেঞ্চুরি ও তিনিটি হাফ সেঞ্চুরি সহ মোট ৪০৮ রান। উইকেট নিয়েছেন ২২ টি। পরীক্ষার কারণে পাকিস্তান সফর ও কিটপ্লাই কাপ সিরিজটা মিস না করলে হয়ত মাশরাফিকেও টপকে যেতেন। আর যে আটটি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন তাতে ২৯.৫৭ গড়ে করেছেন ৪১৪ রান, চারটি পাঁচ উইকেট নিয়ে মোট শিকার করেছেন ৩০ টি উইকেট। শাকিব একাধারে ২০০৮ এ টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্ছ রানকারী ও উইকেট সংগ্রাহক। ২০০৮ এ এই সেরা পারফর্ম্যান্সে সাকিব নিশ্চই সন্তুষ্ট, কিন্তু চিরকালের নির্লিপ্ত ও নিরুচ্ছাস স্বভাবের এই ক্রিকেটারের মনে সেরা সাফল্যের কারণে কোন আতিশায্য ও উদ্বেলতার কোন জোয়ার নেই; আল হাসান বরং সামনের অনাগত দিনগুলোতে আরো কীভাবে বেশি ভালো করা যায়, সেই চিন্তায়ই নিজেকে নিমগ্ন রাখছেন।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শাকিবের সেঞ্চুরি

দলের অধিনায়ক হওয়ার কারনেই হোক, দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে দুইবার বাউন্স করা বলে ডি ভিলিইয়ার্সের উইকেট নেয়ার কারনেই হোক, সমর্থকের সাথে বিবাদে জড়িয়ে যাওয়ার কারনেই হোক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কারণেই হোক, আইসিএল এ জড়িত থাকার ব্যাপারেই হোক কিংবা প্রতিভার বিপরীতে পারফর্ম্যান্সের ব্যবধানের কারনেই হোক- বরাবরের মতই বছরের সবচেয়ে আলোচিত খেলোয়াড় ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। একদিনের ম্যাচে মোটামুটি ভাল একটা বছর কাটলেও (একদিনের ম্যাচে গড় ২৯.৩৯) টেস্টে আশরাফুলের ক্যারিয়ারে ২০০৮ হয়ে থাকবে ‘মঙ্গা’ হিসেবে। বছরের শেষ দিনে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে একটি সেঞ্চুরি করেছেন বটে, তবে এই সেঞ্চুরি বাদ দিলে বছরের বাকী ১৬ ইনিংসে তাঁর রান গড় মাত্র ১০.৭। উপরন্তু শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তাঁর এই শতরান কী ধারাবাহিকতায় ফেরার পুর্বাভাস, নাকি শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তাঁর চিরাচরিত ত্রাসময় ঝলকানিগুলোরই একটি, তা নির্ধারণের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে বাংলাদেশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর পর্যন্ত।

২০০৮ সালে বলার মত অন্যান্য পারফর্মাররা হলেন তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, জুনায়েদ সিদ্দিকী ও মাশরাফি বিন মর্তুজা। তামিম ইকবাল ২০০৮ এ একদিনের ম্যাচ ও টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশের পক্ষে যথাক্রমে সর্বোচ্চ ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ছাব্বিশটি ওয়ান ডে ম্যাচ খেলে তামিম একটি সেঞ্চুরি ও পাঁচটি হাফ সেঞ্চুরিসহ ৩১.০১ গড়ে করেছেন ৮০৭ রান। নয়টি টেস্ট ম্যাচে ২৪.৬২ গড়ে করেছেন ৩৯৪ রান। ভাল শুরু করে টেনে নিয়ে যাওয়ার ব্যর্থতার কারণে অর্ধশত রানের কোঠা পেরিয়েছেন মাত্র দুবার। মুশফিকুর ও জুনায়েদ ওয়ানডেতে খুব ভাল পারফর্ম করতে না পারলেও টেস্ট ম্যাচে মোটামুটি ভালো করেছেন। তামিমের সমান সংখ্যক টেস্ট ম্যাচ খেলে জুনায়েদ ২২.১৭ গড়ে ৩৭৭ এবং মুশফিক ২২.৩১ গড়ে ৩৫৭ রান করেছেন। উভয়েই তিনটি করে হাফ সেঞ্চুরি করেছেন। বছরের প্রথমার্ধটা মাশরাফি মুর্তুজার জন্য খারাপ কাটোলেও শেষার্ধে এসে নিজের বোলিং ছন্দ ফিরে পেয়েছেন। পতন-উত্থানের পর তিনিই ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী। পঁচিশ ম্যাচে ৩৬.২৮ গড়ে তুলে নিয়েছেন ২৮ উইকেট। রান আর উইকেটের চেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় বিষয় হল তামিম ইকবালের পরিপক্বতা, মুশফিকুরের সবসময় নিজের সাথে নিজের লড়াই করা, জুনায়েদের দৃঢ়তা আর মাশরাফি মুর্তুজার দায়িত্বজ্ঞান ও স্বরূপে প্রত্যাবর্তন।

২০০৮ সালে জাতীয় দলে নতুন যে মুখগুলো এসেছে তার মধ্যে রকিবুল হাসান, মাহবুবুল রবিন আর নাঈম ইসলামের নাম উল্লেখযোগ্য। তবে সবচেয়ে ভাল পারফর্ম করেছেন রকিবুল হাসান। ইনজুরিতে পড়ার আগ পর্যন্ত রানের মধ্যে ছিলেন তিনি। ইনজুরির কারনে স্বাভাবিক ছন্দপতন ঘটলেও আবারো ছন্দে ফেরার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে তাঁর ব্যাটিং দেখে। বাংলাদেশের মিডল অর্ডারের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে ওঠার সমস্ত প্রতিভাই রয়েছে ডান হাতি এই ব্যাটসম্যানের।

নাঈমকে টেস্ট ক্যাপ পরিয়ে দিচ্ছেন মোহাম্মদ আশরাফুল

নতুন বছরের শুরু থেকেই ফেরার লড়াইয়ে নিবিষ্ট থেকতে হচ্ছে একদিনের ম্যাচে বাংলাদেশের দুই সেরা বোলার সৈয়দ রাসেল ও আব্দুর রাজ্জাককে। সেই ২০০৭ এ পিঠের ইনজুরিতে পরার পর ২০০৮ এর প্রায় পুরোটাই বেশ ভুগলেন রাসেল। এরই মাঝে ঘরের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একদিনের রিরিজে নজরকাড়া পারফর্ম্যান্স করেছেন, কিন্তু সেই ইনজুরির কারণে আরো ছয় মাস পুনর্বাসনে থাকতে হচ্ছে রাসেলকে। অন্যদিকে আব্দুর রাজ্জাক অবৈধ বোলিং অ্যাকশনের কারণে আবারো নিষিদ্ধ হয়েছেন। ভুল শোধরানোর আগ পর্যন্ত তাই মাঠের বাইরেই থাকতে হচ্ছে আবদুর রাজ্জাককে।

২০০৮ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিয়েছেন জাতীয় দলে দীর্ঘ দি্ন ধরে খেলা দুই খেলোয়াড়ঃ উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান খালেদ মাসুদ আর বাঁ হাতি স্পিনার মোহাম্মদ রফিক। আক্ষেপের গল্প এখানেও। দুজনেই মনের মধ্যে একটা ক্ষোভ নিয়ে বিদায় নিয়েছেন। মাসুদ একটি বিদায়ী ম্যাচ পাননি। আর মোহাম্মদ রফিককে একপ্রকার জোর করেই বিদায় দেয়া হয়েছে। তবে দিন বদলের পালায় তারা নিশ্চয় ‘এসেছে নতুন শিশু, ছেড়ে দিতে হবে স্থান’-এই সত্যকেই বড় করে দেখতে চাইবেন, ভুলে যেতে চাইবেন হতাশার দীর্ঘনিশ্বাসগুলি। ‘এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি’ একথা মনের মধ্যে পুষে রেখে সেই ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি টুর্নামেন্ট থেকে শুরু করে অবসর নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত নবীনদের মঞ্চ প্রস্তুতকরণের জন্য খালেদ মাসুদ মাসুদ ও মোহাম্মদ রফিক তাদের সামর্থ্যের সেরাটা দিয়ে যে অবদান রেখে গেছেন, বাংলাদেশের সকল ক্রিকেট খেলোয়াড় ও ক্রিকেটানুরাগী তাঁদের সে অবদানের কথা চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

অবকাঠেমো ও গুণগত মানের তেমন পরিবর্তন না হলেও এবারের তারকাবিহীন জাতীয় লীগ একেবারে খারাপ কাটে নি। ব্যাট হাতে এবারের লীগের সেরা পারফর্মার হলেন ফয়সাল হোসেন ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। বল হাতে সোহরাওয়ার্দী শুভ। জাতীয় লীগ শেষ দিকে জমে ওঠেছিল বেশ। এই জমে ওঠার মধ্যে রয়েছে আরেকটি আশা ভঙ্গের গল্প। সেই আশা ভঙ্গ ইমরান আহমেদের বরিশাল দলের। সমান সমান পয়েন্টে লীগ শেষ করার পরও বেশি জয়ের কারণে লীগ শিরোপা ওঠে রাজশাহীর অধিনায়ক আনিসুরের হাতে। তবে ছেলেরা যে কেবল খে্লার জন্য জাতীয় লীগ খেলেছে না, জয়ের জন্য খেলছে, এ প্রাপ্তিটাই বা কম কী!

নতুন বছরের প্রত্যাশা কী হওয়া উচিত? উত্তরণের এই বছরেও দীর্ঘনিঃশ্বাস আর আক্ষেপের আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা বাংলাদেশের ক্রিকেটানুরাগীদের মনে প্রত্যাশার প্রশ্নে তাই একটা প্রশ্নই ঘুরে ফিরে উঁকি দেয়, “রাত পোহাবার আর কত দেরি পাঞ্জেরি?” রাত পোহাবার মনে হয় আর দেরি নেই, নতুন বছরের প্রত্যাশার কথা বলতে গিয়ে এমনি আশাবাদ ঝরে পড়ল জাতীয় দলের বর্তমান উইকেটকিপার-ব্যাটম্যান মুশফিকুর রহিমের কণ্ঠেঃ “জেমি সব সময় বলে ২০০৯ সাল হবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে বড় অর্জনের বছর। আমার মনে হয় আমরা সেভাবেই এগুচ্ছি। টেস্টে আমরা কেউই কখনো ধারাবাহিক ছিলাম না। নতুন বছরে নিজে এবং দল হিসেবে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করতে চাই। এক ইনিংসে ৪০০ রান করে চার-পাঁচ টেস্ট খারাপ খেলা নয়; বিশ্বসেরা দল, বিশ্বসেরা খেলোয়াড়রা যেভাবে খেলে, আমরাও সেভাবে খেলতে চাই।” আর বেড়ালের মত নয়, বাঁচতে হলে বাঘের মতই বাচঁব-এই প্রত্যয় নিয়েই নতুন বছরে পা রাখছে বাংলাদেশ ক্রিকেট।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s