আমার পড়া কিছু বই

বই পড়তে ভালোবাসি সবসময়ই। কিন্তু পড়াশোনার চাপে সবসময় বই পড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফল আর স্প্রিং সেমিস্টারের মাঝে এবার তাই যে আবকাশটুকু পেলাম, তাতে পরলাম বেশ কয়েকটি বই। এ সম্পর্কেই লিখছিঃ

নৌকাডুবি-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমরা ত কবি রবীন্দ্রনাথের সাথেই পরিচিত। রবি ঠাকুর অবশ্য একজন নাট্যকার, গীতিকার, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার ও গল্পকারও বটে। ‘নৌকা-ডুবি’ তাঁর অসাধারণ এক উপন্যাস। (কানে কানে বলে রাখি, আওয়ামী লীগের এই সুসময়ে নৌকাডুবি নামটা হঠাৎ কেমন জানি শোনায়, তাই না?)। উপন্যাসের ঘটনা সংক্ষেপ এইঃ সদ্য পাস করা আইনের মেধাবী ছাত্র রমেশ অন্নদাবাবুর মেয়ে হেমনলিনীর প্রেমে পড়ে। কিন্তু রমেশের বাবা ধরে বেঁধে রমেশের বিয়ে দিয়ে দেন সুশীলা নামের এক মেয়ের সাথে। বিয়ের রাতে রমেশ ও তার পরিবার যখন বৌ নিয়ে ফিরছিল, তখন বৈশাখী ঝড়ে নৌকাডুবি ঘটে। নৌকাডুবির পর কেবল রমেশ বেঁচে থাকে। জ্ঞান ফিরলে রমেশ নিজেকে আবিষ্কার করে একটি দ্বীপে। তার পাশে ছিল একটি মেয়ে। বিবাহ আসরে নতুন বৌ এর মুখ ভাল করে দেখে নি বলে এই মেয়েকেই ভেবে বসে স্ত্রী হিসেবে। কিন্তু এই মেয়েটি ছিল আসলে কমলা। দৈবক্রমে কমলারও সে রাত্রে বিবাহ হয়েছিল, আর সেও তার বরযাত্রীদের সঙ্গে ফিরছিল। কমলার বর ছিল নলিনাক্ষ ডাক্তার। সলজ্জ কমলাও বিবাহ আসরে লজ্জায় নলিনাক্ষের মুখ দেখেনি, তাই সেই নির্জন দ্বীপে রমেশের সাথে নিজেকে আবিষ্কার করার পর রমেশকেই স্বামী ভাবতে শুরু করে। রমেশ কমলাকে সুশীলা বলে ডাকলে কমলা জানায় যে যে তার নাম সুশীলা নয়। তখনি রমেশ বুঝতে পারে যে এই কমলা তার স্ত্রী নয়। দোটানায় পরে রমেশ। না সে কমলাকে কাছে রাখতে পারছে, না সে হেমনলিনীকে বিয়ে করতে পারছে। এদিকে হেমও রমেশের বিরহে প্রচন্ড কাতর হয়ে পড়ে। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে নলিনাক্ষের সাথে কমলার মিলন হয়, কিন্তু হেমর সাথে রমেশের বিয়েটা শেষ পর্যন্ত হয়েছিল কিনা, উপন্যাস সে সম্পর্কে নীরব।

নৌকাডুবি উপন্যাস পরার আগে আমি ভাবতাম, মানুষের এমন অনেক অনুভুতি আছে, যেগুলো কেবল অনুভবই করা যায়, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। নৌকাডুবি পরার পর বুঝলাম, আমার সে ধারণা ভুল। কেউ যদি রবীন্দ্রনাথের মত প্রতিভা নিয়ে জন্মায়, তাহলে যে কোন অনুভুতিকেই সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে। দুটি একটি নমুনা নিচে পেশ করলামঃ

কমলা যখন সুদীর্ঘ বিরহের অপেক্ষা শেষে নলিনাক্ষের সাথে পুনর্মিলিত হয়, তখন কমলার মনের ভাব লেখক প্রকাশ করেছেন এভাবেঃ

“……দুঃসহ লজ্জা আর তাহাকে পীড়ন করিল না।  হর্ষের উল্লাস নহে কিন্তু একটি বৃহৎ মুক্তির অচঞ্চল শান্তি তারার অস্তিত্বকে প্রভাতের অকুন্ঠিত উদারনির্মল আলোকের সহিত ব্যপ্ত করিয়া দিল। একটি গভীর ভক্তি তাহার হৃদয়ে কানায় কানায় পূর্ণ হইয়া উঠিল, তাহার অন্তরের পূজা সমস্ত বিশ্বকে ধূপের পূণ্য গন্ধে বেষ্টন করল। দেখিতে দেখিতে কখন অজ্ঞাতসারে তাহার দুই চক্ষু ভরিয়া আসিল; বড় বড় জলের ফোটা তাহার দুই কপোল দিয়ে ঝরিয়া পরিতে লাগিল, আর থামিতে চাহিল না, তাহার অনাথ জীবনের সমস্ত দুঃখের মেঘ আজ আনন্দের জলে ঝরিয়ে পড়িল…”

হেমকে দেখতে না পেয়ে রমেশ পূর্ব স্মৃতি রোমন্থন করেছিল এভাবেঃ

“এ কী বিস্ময়! এই জনপূর্ণ নগরের মধ্যে ঐ সামান্য গৃহের ভিতরে একটি মানবীর বেশে এ কী বিস্ময়! এই রাজধানীতে কত ছাত্র, কত উকিল, কত প্রবাসী ও নিবাসী আছে, তাহার মধ্যে রমেশের মত একজন সাধারণ লোক কোথা হইতে একদিন আশ্বিনের পীতাভ রৌদ্রে ঐ বাতায়নে একটি বালিকার পাশে নীরবে দাঁড়াইয়া জীবন ও জগতকে এক অপরিসীম-আনন্দময় রহস্যের মাঝখানে ভাসমান দেখিল—এ কী বিস্ময়! হৃদয়ের ভিতরে আজ এ কী বিস্ময়! হৃদয়ের বাহিরে আজ এ কী বিস্ময়!”

রবীন্দনাথের আরেকটি আসাধারণ ক্ষমতা হল চমৎকার analogy ব্যবহারের ক্ষমতা। যেমনঃ

“ঊষার আলো যেমন দেখিতে দেখিতে প্রভাতের রৌদ্রে ফুটিয়া পড়ে, কমলার নারী প্রকৃতি তেমনি অতি অল্পকালের মধ্যেই সুপ্তি হইতে জাগরণের মধ্যে সচেতন হইয়া উঠিল।”

২২৬ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসে রবীন্দনাথ যেভাবে suspense সৃষ্টি করেছেন, সেটিও অত্যন্ত বিস্ময়কর।

ঘরে বাইরে-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলো পড়লে বোঝা যায় যে তিনি একজন বড় মাপের দার্শনিকও ছিলেন। কেউ যদি তাঁর দর্শনবিষয়ক জ্ঞানের একটু পরিচয় পেতে চান, তাহলে পরে দেখুন ‘ঘরে বাইরে’। এই উপন্যাসটি মূলত একটি আত্মজীবনী। আত্মজীবনী তিনজনের- বিমলা, নিখিলেশ ও স্বন্দীপ। বিমলা পতিগতপ্রাণা ও সতী। রূপের সৌন্দর্য না থাকলেও সতীত্বের গর্বে সে এসেছিল নিখিলেশের সংসারে। নিখিলেশ ছিল একজন চরম নীতিবান আদর্শ মানুষ। তাদের এ সুখের ঘরকন্নায় উপস্থিত হয় স্বদেশীর নেতা সন্দীপ। ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে সন্দীপের সাথে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পরে বিমলা। দার্শনিকতার আলোকে বিচার করলে এই উপন্যাসের এই ঘটনাগুলো নিতান্তই তুচ্ছ। মূল উপজীব্য বিষয় হল এ ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে রবি ঠাকুরের বিমলা, নিখিলেশ ও সন্দীপের মনস্তুত্বের চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ। আমি ক্ষুদে পাঠক মাত্র; রবীন্দ্রনাথ মানুষের মনের মধ্যকার সু এবং কু এর দ্বন্দ্ব যে ভাবে ভাষার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন ঘরে-বাইরে উপন্যাসে,  আমি উপন্যাসটি পড়ার মাধ্যমে তা কেবল অনুভব করতে পারি আর বিস্মিত হতে পারি, এই অনুভবটা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। পুনরায় বলছি, কেউ যদি রবীন্দনাথের অনন্যসাধারণ দার্শনিক ক্ষমতার সাথে পরিচিত হতে চান, পড়ে দেখুন এই উপন্যাসটি।

এই উপন্যাসের সন্দীপের আত্মজীবনীর প্রথম অংশ আমি নিচে ছবি আকারে পোস্ট করলাম। অনুগ্রহ করে পড়ে দেখুন। আমাদের দেশের যে কোন রাজনৈতিক নেতা/নেত্রীর আত্মজীবনীর সাথে তা হুবহু মিলে যাবে।

আজ চিত্রার বিয়ে-হুমায়ূন আহমেদ
উপন্যাসটি পড়ে আমার চোখে সত্যি পানি এসেছিল। চিত্রার বয়স্ক বাবা  ঘরের কারো কাছে খুব একটা পাত্তা পান না। যা খেতে মনে চায় স্ত্রী তা রান্না করেন না। এভাবে তার মানসিক বিকৃতির মত হয়। মাছের সাথেও কথা বলতে পারেন। চিত্রার বাবার বোনের বিয়ে হয়েছিল গুন্ডা টাইপের এক ছেলের সাথে। বেচারী বোন তার তার কষ্টের কথা ভাইয়ার কাছেই বলে, কারণ তার আর দুই কূলে কেউ নেই। স্ত্রীর কর্তৃত্বের কারণে ভাইও কিছু করতে পারেন না। এক সময় ভগ্নীপতি বোনকে ঘর থেকে বের করে দিলে চিত্রার বাবা তাকে নিজের বাসায় নিয়ে আসেন। কিন্তু স্ত্রীর কারণে রাখতে পারেন নি। অগত্যা বোন তাকে রেলস্টেশনে রেখে আসতে বলে। কিন্তু চিত্রার বাবা সব কিছু মিটমাট হয়ে যাবে ভেবে বোনকে তার হিংস্র স্বামীর বাসায় রেখে আসে। নিরুপায় মেয়েটি তারপর আত্মহত্যা করে।

পরের দিন চিত্রার বাবা ছোট বোনের অনেক দিনের সখের জিনিস কাচের চুড়ি আর কিছু কাঁচা বাজার নিয়ে বোনের বাসায় রওনা হয়। এই সামান্য সখ পূরণেই তার বোন যে কত খুশি হবে, মনে ভাবে সে কথাই ভাবছিল সারাক্ষণ। আরো ভাবছিল যে আজ তার বোন তার ভায়ের যা মনে চায় তাই রান্না করবে। কিন্তু ভাই দেখতে পায় বোনের লাশ। শোকে নির্বাক ভাই তখন তার স্নেহের মৃত বোনের সাথেও কথা বলতে পারে। উপহার দেয় সেই কাচের চুড়ি।

ভালোবাসা প্রেম নয়সুনীল

কামাল নামক এক সংবেদনশীল, পরোপকারী, সৎ, নির্লোভ ছেলের দুঃখের কাহিনী এই উপন্যাস। পড়ে কামালের জন্য অনেক খারাপ লাগল।

বৃষ্টি বিলাসহুমায়ূন আহমেদ

শামা নামক এক মেয়ের বিয়ের জন্য উদগ্রীব বাবা তাঁরই অফিসে কাজ করা এক হ্যাংলা-পাতলা ছেলে ঠিক করেন। ছেলের নাম আতাউর। প্রথমে আতাউরকে পছন্দ হয়নি শামার। গরিব গোছের ছেলে। আবার একটু পাগলামিও আছে। বিয়ে পাগলা বাবা কি তাহলে এক পাগলের সাথে শামার বিয়ে দেবেন? ঠিক এ সময় ই আবার শামার শিক্ষিকা কোন এক বড়লোক ছেলে খুঁজে বের করেন শামার জন্য। কিন্তু সেই হ্যাংলা-পাতলা গরিব পাগল আতাউরের সাথে কথা বলে শামার পরে তার হঠাৎ পাগলামির কারণ জানতে পারে। আতাউরের ছোটবেলায় এক বৃষ্টির দিনে তার চোখের সামনেই তার বাবকে জবাই করে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা। তারপর থেকে বৃষ্টি দেখলেই আতাউরের মাথা এলোমেলো করে দেয় সেই দুঃসহ স্মৃতি। জীবনে কোন মেয়ে তাকে ভালোবাসেনি। তবে হ্যাঁ, কোন মেয়ে যদি তাকে গভীরভাবে ভালোবেসে তার জীবনসঙ্গী হয়, তাহলে হয়ত সে সেই মেয়েটির হাত ধরে আবার বৃষ্টিতে ভিজতে পারবে। শামার মতের পরিবর্তন হয় সেদিন। বড়লোক বনে যাবার ইচ্ছা ত্যাগ করে শামা। সেদিনও মেঘলা আকাশ থেকে বৃষ্টি নামছিল । শামার চোখ থেকেও নামছিল অশ্রু। ‘বৃষ্টি বিলাস’, এর চেয়ে সুন্দর নাম গল্পটির হওয়া সম্ভব নয় বলে আমার বিশ্বাস।

লিপি (ছোটগল্প)-হুমায়ূন আহমেদ

ক্যাথারিন নামের এক মেয়ে ছিল এক কথায় nerd. তার সাথে কেউ ডেটিং করত না, কারণ সবাই ভাবত ডেটিং এ গেলে না আবার পদার্থ বিজ্ঞানের কটমটানি শুনতে হয়। কিন্তু এরিখ নামের এক ছেলে তাকে একদিন ডেটিঙ্এর প্রস্তাব দিলে চোখে পানি এসে যায় ক্যাথারিনের। এরিখ কেবল সেদিনই জানতে পারে যে ক্যাথারিন কত কোমলমতি। ক্যাথারিন জানায় যে কেউ আসলে তার সাথে কথা বলে না, তাই তার পড়াশোনা ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না। তার পর তারা বিয়ে করে নেয়। তারা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দম্পতি। কিন্তু দু-বছর পরই ক্যাথারিনের এক দুরারোগ্য অসুখ হয়। মৃত্যুর ঠিক আগে সে এরিখকে এক দুর্বোধ্য লিপি দিয়ে যায়। দুঃখী এরিখ আজীবন চেষ্টা করেছে সেই লিপি উদ্ধার করার জন্য। লিপি উদ্ধারের জন্য সে লেখক হুমায়ূন আহমেদেরও সাহায্য নিয়েছিল। এরিখ তার মৃত্যর ঠিক আগে সেই লিপির পাঠোদ্ধার করতে পেরেছিল। এটা সে হুমায়ূন আহমেদকে জানিয়েছিল চিঠির মাধ্যমে। কিন্তু পাঠোদ্ধারকৃত মর্ম জানায়নি।

এই শুভ্র এই-হুমায়ূন আহমেদ

বইটি ই শুভ্র নামক এক ছেলেকে নিয়ে লেখা। হুমায়ূন আহমেদের এই চরিত্রটিকে আমার খুবি ভালো লাগে। অসম্ভব handsome শুভ্র এমন এক ছেলে যে কিনা পরীক্ষায় কোনদিন সেকেন্ড হয়নি। বাবার অঢেল টাকা থাকা সত্ত্বেও শুভ্র বাবার মত নয়। মানুষকে তার দিতে ভালো লাগে। শুভ্র অত্যন্ত সংবেদনশীলও বটে।

আমার কেন জানি নিজেকে মাঝে মাঝে শুভ্র হিসেবে ভাবতে ভালো লাগে। শুভ্রর মত সুন্দরও নই, আবার এমনও নই যে জীবনে কোনদিন সেকেন্ড হইনি। তবে শুভ্রর মার মত আমার মাও আমাকে এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s