ইভ টিজিং কিভাবে বন্ধ হবে?

Eve Teasing

[বিঃদ্রঃ এটি আমার অনেক পুরনো লেখা। আমার সব লেখাকে একটি ব্লগে আর্কাইভ করতে চাচ্ছি, এই উদ্দেশ্যেই কেবল লেখাটিকে এখানে ছাপানো হল।]

বাংলাদেশে ইদানিং ইভটিজিং এর প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন সম্মানিত শিক্ষক এবং একজন মা প্রাণ দিয়েছেন। এই ব্যাধি কিভাবে নিরাময় করা যায়, সে ব্যাপারেও বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, মনের আধুনিকায়ন ও উদারতা বৃদ্ধি সহ আরো অনেক প্রস্তাব । আইন-শৃংখলা কঠোর করার প্রস্তাবও রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, ইসলামী মূল্যবোধ প্রচারের মাধ্যমে যে এই অসুখ সারানো যায়, তা কেউ আলোচনা করেননি। মনে হয় কেউ ভেবেও দেখেননি। তাইএই মহান বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি আল্লাহ এবং বিশ্বনবী মুহাম্মদ (স) এর বাণী ও কাজের কথা একবারও কেউ বলেন নি। ব্যাপারটা দুঃখজনক, কিন্তু আমার কাছে মোটেও বিস্ময়কর মনে হয়নি। কারণঃ

• একঃ প্রভু প্রদত্ত জীবন বিধান ইসলাম সম্পর্কে আমাদের সঠিক জ্ঞানের অভাব।

• দুইঃ আমাদের বর্তমান আলেম সমাজের কাজের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপনের অভাব।

• তিনঃ “আমাদের মা-বোনেরা পর্দা করে, আপনারা করেন না ক্যান? রাস্তায় মাইয়া মানুষ এইভাবে বাইর হলে এই রকম হবেই”- অনেক ইভটিজারের কাছ থেকে এ বক্তব্য শোনার পর স্বভাবতই যারা পর্দা করেন না, তাদের ভেতর ইসলাম সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা গড়ে ওঠে।

ব্যাপারগুলি এবার খতিয়ে দেখা যাক। খতিয়ে দেখার আগে আমি একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই যে, আমার এ আলোচনা পর্দা বিষয়ক নয়। পর্দা সম্পর্কে অন্য আলোচনা হতে পারে।

আসল কথাটা প্রথমেই বলে ফেলিঃ ইভটিজিং বন্ধের সবচেয়ে প্রধান উপায় হল আল্লাহকে ভয় করা। আল্লাহ যখন মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তখন মানুষের ভেতর সু (রূহ) এবং কু (নফস) নামের দুটি ভিন্ন সত্তা সৃষ্টি করেছেন। তারপর মানুষের মধ্যে আল্লাহ বিভিন্ন প্রবৃত্তি সৃষ্টি করেছেন। এই প্রবৃত্তি শাশ্বত, এবং তা অস্বীকারের কোন উপায় নেই। কিন্তু এই প্রবৃত্তিই শেষ কথা নয়। আসল কথা হল প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ (সু বা কু) এবং বিকাশপথ। যেমন ধরা যাক, সব মানুষই সম্পদ গড়তে চায়। কেন চায়? এটা আমাদের একটা প্রবৃত্তি। যেহেতু প্রবৃত্তি থাকা দোষের কিছু নয়, তাই প্রবৃত্তি ত পূরণ করতেই হবে। কিন্তু এই প্রবৃত্তির পূরণ তথা প্রবৃত্তির প্রকাশটা যেন সঠিক পথে হয়। টাকা-পয়সা অর্জন করছি ঠিক আছে, কিন্তু সেটা যেন বৈধ পথে হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে পথে বলেছেন, সে পথে যেন হয়। অবৈধ পথে যেন না হয়। সুদ, ঘুষ, চুরি বা ছিনতাইয়ের মাধ্যমে যেন না হয়। এই প্রবৃত্তির সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও সুন্দর প্রকাশই এ পৃথিবীতে মানুষের চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হবে, আল্লাহ তাদের পরকালে পুরস্কৃত করবেন। যারা অনুত্তীর্ণ হবে, তাদের আল্লাহ তিরস্কৃত করবেন এবং কঠোর শাস্তি দিবেন।

এই যে ইভটিজিং নামক সামাজিক সমস্যা, এটা কিন্তু পুরুষদের একটা প্রবৃত্তির বিকৃত ও অসুন্দর প্রকাশ।  আমরা সবাই প্রবৃত্তির সুস্থ এবং সুন্দর প্রকাশ চাই। আর সে সুন্দর প্রকাশের জন্য আমরা আজ শিক্ষা, আধুনিকায়ন, এবং মনের উদারতা সহ আরো আনেক কথা বলছি। কিন্তু কোন কিছুই প্রত্যাশিত ফলাফল আনছে না। আমাদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া ছাত্ররা ইভটিজিং এর বেলায় এক ধাপ এগিয়ে। সমাজ গড়ার কারিগড় শিক্ষক এবং সমাজের রক্ষক পুলিশও আজকাল যৌন হয়রানি করে। আজকাল মোবাইল ফোনে ছেলেরা যত্র-তত্র নগ্ন ছবি রেকর্ড করছে। আমি শিক্ষা, আধুনিকায়ন, মনের উদারতা, এসবের বিরোধিতা করছি না; বলছি না যে এগুলোর দরকার নেই। কিন্তু মানুষের প্রবৃত্তি নামক জিনিসটা এতই শক্তিশালী, যে এই প্রবৃত্তির সঠিক নিয়ন্ত্রণ হতে পারে কেবল আল্লাহকে ভয় করে তাঁর এবং তাঁর রাসূলের আদেশ নিষেধ মেনে চললে।

এবার দেখা যাক, ইভটিজিং রক্ষায় ইসলাম কী বলেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেনঃ

“বিশ্বাসী পুরুষদেরকে তাদের দৃষ্টি নত রাখতে এবং শিষ্ট হতে বল। এটা তাদের জন্য পবিত্র। তারা কী করছে, আল্লাহ সে ব্যাপারে অবহিত। এবং বিশ্বাসী নারীদেরও তাদের দৃষ্টি নত রাখতে এবং শিষ্ট হতে বল ।“ (সুরা নুরঃ ৩০-৩১)

রাসুলাল্লাহ (স) বলেছেন, “চক্ষুও ব্যাভিচার করতে পারে। আর চোখের ব্যাভিচার হল দৃষ্টিপাত (পর নারী বা পুরুষের প্রতি)”

রাসুলাল্লাহ (স) আলী (র) কে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, “হে আলী! কোন পর-নারীর উপর একবার দৃষ্টিপাত হয়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করবে না। প্রথমবার দৃষ্টিপাত ভুলবশত, তাই ক্ষমার্হ, আর দ্বিতীয়বার হল ইছাকৃত।”

একজন মহিলা পুরুষের সামনে দিয়ে গেলে, শয়তান পুরুষকে প্রলুব্ধ করে দৃষ্টিপাত করার জন্য। শয়তানের এই প্রলুব্ধতা থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু অজেয় প্রতিসম এই কাজকেও জয় করা সম্ভব একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসুলের সতর্কবানী স্মরণ করে। রাসুল (স) বলেছেন, “এভাবে দৃষ্টিনত করা কষ্টকর হতে পারে, কিন্তু যে দৃষ্টিনত করবে, অন্তরে সে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করবে।“

রাসূলাল্লাহ (স) আরো বলেছেন, “এ পৃথিবী মিষ্টি ও সবুজ, এবং আল্লাহ তোমাদের কর্মের উপর দৃষ্টি রাখছেন। সুতরাং, তোমরা পৃথিবী আর নারীদের ব্যাপারে ভয় কর, কেননা বনী ইসরাঈলের প্রথম বিচার হয়েছিল নারীদের ব্যাপারে।“

ত ভাইয়েরা আমার, যেখানে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল কেবল চাহনির উপরই এত কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে ইভটিজিং তো কল্পনাও করা যায় না। আর আমাদের কিছু লোকজন ইভটিজিং করে আবার হয়রানির শিকার নারীদের হুঙ্কার দিয়ে বলে, “পর্দা না করলে এ ধরণের গুতা ত খাইতেই হইব”। ভাবখানা এরকম, যেন কেউ পর্দা না করলেই ইভটিজিং ধর্মীয় বৈধতা লাভ করে। এই ধরণের ধৃষ্টতা যারা প্রদর্শন করে, আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে তাদের ভয় থাকা উচিত। কারণ, প্রথমত তারা ইভটিজিং করে আল্লাহর বিধান ভংগ করছে। দ্বিতীয়ত, তারা বলতে চায় যে পর্দা না করলে ইভটিজিং করতে কোন ধর্মীয় বাধা নেই, যা সম্পূর্ণ ভুল, মনগড়া এবং তাদের এই ধৃষ্টতা ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ও ভ্রান্ত মনোভাব সৃষ্টিতে ভুমিকা রাখে।

ইভটিজিং রক্ষার ব্যাপারে আমাদের আলেম সমাজ কী করছেন? উনারা কাজের মাধ্যমে কী দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন সাধারণ মানুষের জন্য? আলেম সমাজের দায়িত্ব হল মানুষকে ইসলামী জ্ঞান দানের পাশাপাশি তাঁদের কর্মে তার প্রতিফলন ঘটিয়ে দেখানো। ঢালাওভাবে বিচার করতে চাই না, কিন্তু আজকাল বেশির ভাগ আলেমের কাজেকর্মেই ইসলামে বাস্তবায়ন নেই । আলেম সমাজ আজকাল ইসলামের মূল শিক্ষাগুলোকে কর্মে পরিণত করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন না। অনেকেই থাকেন খালি একের অধিক বিবাহ এবং টাকা কামানোর ধান্ধায়। ইঞ্জিনিরাং পড়ে কেউ যদি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাক্টিস না করে, সে ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার কী কোন দাম আছে? নাই। তেমনি ইসমালের জ্ঞান অর্জন করে কেউ যদি সে জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ না করে, সেই ইসলামি জ্ঞানের আর কোন কানাকড়ি মূল্যও থাকে না। প্রয়োগবিহীন সেই জ্ঞান পরকালে মুক্তি লাভের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে না, উল্টো জাহান্নামে যাওয়ার সার্টিফিকেট হিসেবে কাজ করবে।  আলেম সমাজের এই অবস্থা হলে সাধারন মানুষ কার কাছ থেকে শিখবে? তাই আলেম সমাজকে বলছি,  মূর্তি ভাঙ্গার জিগির (আমি বলছি না যে মূর্তি থাকা উচিত, পূজ়া করি আর না করি, সত্যিকার একজন মুসলমানের অন্তরে যেকোন ধরণের মূর্তির প্রতি কোন ধরণের সহানুভুতি থাকতে পারে না; বাংলাদেশের মাটিতেও কোন মূর্তি রাখার পক্ষে আমি নই, হোক সেই মূর্তি অপরাজেয় বাংলা) তোলার আগে প্রথমে আগে নিজেদের সকল কাজ-কর্ম, আচার ব্যবহারে ইসলামের ও আল্লাহর নবীর সুন্নাতের প্রকাশ ঘটিয়ে মানুষকে ইসলামের বিধানাবলি অনুসরণের সুবিধা ও উপকার সম্পর্কে অবগত করুণ। ভন্ডামির রাজনীতি থেকে দূরে সরে আসুন এবং ধর্মকে দুনিয়া কামানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করুণ। দুনিয়া কামানোর নিয়তে ‘দেশ থেকে ইসলাম গেল’ আওয়াজ তুলে ভণ্ডামির রাজনীতি করলে মানুষ আর ইসলামের পথে আসবে না; উলটো ইসলাম মানুষের অন্তর থেকে দূরে সরে যাবে। যেমন যাচ্ছে বর্তমান সময়ে। কারণ পাগলেও ভণ্ডামি বুঝে। দেশের ইসলামের খবরদারির বদলে যদি প্রতিটি আলেম নিজের জীবনে ইসলাম আছে কিনা তার খবরদারি করতেন, আমাদের সমাজের মানুষ ইসলামে থেকে এত দূরে সরে যেত না। বরং আলেমদের কাজ কর্ম দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁদের কাছে আসত।

আরো তিনটি ব্যাপার ইভটিজিং এর আলোচনায় দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি রাখেঃ শিষ্টতা, উদারতা, এবং অশ্লীলতা। ইভটিজিং এক ধরণের অশিষ্ট, অমার্জিত, এবং সর্বোপরি অসভ্য আচরণ যার সম্পর্কে সূরা নূরে আল্লাহ আলোকপাত করেছেন। আর আমাদের কী কোন বিবেক নেই? বিবেক থেকে কী আমরা বুঝতে পারি না কোনটা মার্জিত আর কোনটা অমার্জিত? কোনটা শিষ্ট আর কোনটা অশিষ্ট?

আজকাল আমাদের সমাজের ‘আধুনিক’ লোকজনেরা প্রায়ই বলে থাকেন, মানুষের মনের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্কীর্ণতা হল ইভটিজিং এর অন্যতম কারণ। আমার প্রশ্ন হল মনের উদারতা বা সঙ্কীর্ণতার মানদণ্ড কী? পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুসরণ উদারতা আর ইসলামের অনুসরণ কী সঙ্কীর্ণতা? প্রকৃতপক্ষে আমরা আজ এমন এক কঠিন সময়ে বসবাস করছি, যেখানে কর্মক্ষেত্র, যানবাহন থেকে শুরু করে সর্বত্রই বিদ্যমান নারী ও পুরুষের সহাবস্থান। এই সহাবস্থান ইসলাম কর্তৃক একদমই সমর্থিত নয়। কিন্তু আমরা পুরুষরা যারা ইসলামের পথে চলতে চাই, যারা নারীদের সম্মান করতে চাই, যারা আমাদের প্রভুর নির্দেশ মেনে চলতে চাই, তারা এই পরিস্থিতিকে পরীক্ষা বা “trial” হিসেবে নিতে হবে। আরেকজনের উপর দোষ চাপানোর আগে দেখতে হবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি কিনা। তাই কোন মহিলা কি কাপড়-চোপড়ে বের হল, সেটা ত আমার দেখার বিষয় নয়, আমার দেখার বিষয় হল যে আমি দৃষ্টি নত করছি কিনা। কারণ এটা আমার আয়ত্তাধীন এবং আমার আয়ত্তাধীন বিষয়েই আমাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। আমার আয়ত্তাধীন বিষয় হল আমার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে দৃষ্টিনত করতেই হবে, তা যত কষ্টই হোক না কেন। মনে রাখতে হবে, এই দৃষ্টিনত করণ মনের সঙ্কীর্ণতা থেকে নয়, মনের উদারতা ও নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ইচ্ছা থেকেই। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আর তিনিই মানুষের ‘ফিতরাত’ বা স্বভাব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। সেই মহান প্রভু যেখানে আমাদের দৃষ্টিনত করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সেই নির্দেশ পালনকে কোন অর্থেই “মনের অনুদারতা” বলে আখ্যায়িত করা যায় না।

যে সকল প্রগতিবাদীরা, মানে বাংলাদেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ, কবি-নাট্যকার-গায়ক-বাদক-শিল্পী ও নৃত্যকারের সমাজ, যারা ইসলামকে মধ্যযুগীয় পন্থা বলে প্রতিনিয়ত কলাম লেখেন, যারা প্রতিনিয়ত বলে থাকেন যে অন্য সকল ধর্মের মত ইসলাম ধর্মও মানুষের সৃষ্টি, তাদের কে আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, “আপনারা দ্বিমুখী”। সোজা সাপটা ইংরেজীতে যাকে বলে “You guys are outright hypocrite”। কারণটা জানেন? কারণ আপ্নারা জোর গলায় বলতে থাকেন, মানুষ শিক্ষিত হলে সম্পূর্ণ যৌন-অনুভুতিবিহীন নারী-পুরুষ সহাবস্থান সম্ভব। আপনাদের মতে অন্তর ঠিক থাকলে মধ্যযুগীয় দৃষ্টিনতকরণের মত ঝামেলা নিষ্প্রয়োজন। এই ধরণের খোঁড়া যুক্তি আপনারা দিয়ে থাকেন কারণ আপনারা নিজেদের সাথে লুকোচুরি খেলেন। তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার, মানুষ কিন্তু কেবল নিজেকেই ফাঁকি দেয়, আর কাঊকে সে ফাঁকি দিতে পারে না। আল্লাহকে ফাঁকি দেয়া ত দূরের কথা। এই ধরণের ফাঁকিবাজির উদাহরণ নিজের জীবন থেকেই দেখেছি। যে দোকানদার আমার সাথে ভাল ব্যবহার করে নি, তাকেই দেখেছি কিছুক্ষণ পর এক সুশ্রী নারী ক্রেতার সাথে ফেরেশতার মত ব্যবহার করতে। ড্রাইভিং স্কুলের মহামান্য ইন্সট্রাকটরবৃন্দ পুরুষ শিক্ষার্থীদের সাথে এমন ব্যবহার করত, মনে হত মায়ের গর্ভ থেকে ড্রাইভিং না শিখে অপরাধ করে ফেলেছি। সেখানে নারী শিক্ষার্থীদের, মাশাল্লাহ, একঘণ্টার জায়গার দুই-ঘণ্টা শেখাতে চাইত।  অফিসের কোন বড় কর্তা যখন একজন নারীকে তাঁর সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন, তাঁকে যদি আমি জিজ্ঞেস করিঃ

আমিঃ পুরুষের বদলে নারীকে কেন নিয়োগ দিলেন?

কর্তাঃ আপনি কি তার সেক্রেটারিয়াল দক্ষতার কথা জানেন?

আমিঃ জানি না, শুধু জানি যে আপনি নিজের সাথে ফাঁকিবাজি করছেন। নিজের সাথে ফাঁকিবাজি করতে হলে জাগ্রত থেকেও ঘুমের ভান করতে হয়।

কর্তাঃ আপনি কি বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।

আমিঃ তাহলে বুঝায়ে বলি। আমি শুধু বলতে চাই যে আপনি প্রবৃত্তির দাসত্ব করছেন। আপনার এই দাসত্ব কোন লেভেলে আছে জানি না, তবে লেভেল জিরোতে থাকলেও শয়তান ঠিকই আস্তে আস্তে লেভেল ডিঙ্গাতে সহায়তা করবে।

কর্তাঃ কি অসভ্য, uncultured লোকের মত কথা বলছেন?

আমিঃ আমি অসভ্যের মত কথা বলছি না, সত্য কথা বলছি। সত্য মধুর হয় না, তিতা হয়।

কর্তাঃ আপনার মন কি এত নিচু? এত সংকীর্ণ মনের আপনি? মন এবং অন্তর ঠিক থাকলেই হল।

আমিঃ কেন, আপনার মন এবং অন্তর কি আল্লাহর রাসূলের চেয়েও উদার এবং কলুষমুক্ত?

কর্তাঃ কেন, আল্লাহর নবী কি বলেছেন?

আমিঃ আপনি জানেন কীনা জানি না, আল্লাহ তাঁর রাসুল মুহাম্মদ (স)  এর অন্তর তিনবার ফেরেশতা জিব্রাঈলের (আ) এর মাধমে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। রাসূলের অন্তর থেকে সর্বপ্রকার কু দূর করে সেখানে বিশুদ্ধ ঈমান ও জ্ঞান দিয়ে পূর্ণ করে দিয়েছেন। সেই রাসুল কোন দিন কোন পর নারীর দিকে তাকান নি। সেই রাসূল একদিন তাঁর সাহাবাদের জিজ্ঞাস করেছেনঃ “আমার চেয়ে কলুষমুক্ত অন্তর কী তোমাদের কারো আছে?” সাহাবারা বললেন, “না”। তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, “তবে জেনে রাখো, আমিই কোন পর-নারীর সাথে করমর্দন করি না।”

কর্তাঃ বুঝলাম, কিন্তু মোল্লারা ত দেখলাম দৃষ্টি নত করে না?

আমিঃ আল্লাহ কি বলেছেন যে মোল্লা হলেই বিনা বিচারে এক দৌড়ে জান্নাত চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিবেন? মোল্লাদের বিচার ত হবে সবার আগে এবং তাদের বিচার হবে সবচেয়ে কঠিন। আর আরেক জনের ব্যর্থতা ত আপনার ব্যর্থতার অজহাত হতে পারে না।

কর্তাঃ ধর্ম ত ব্যক্তিগত বিষয়, আপনি কেন আমাকে জ্বালাতন করছেন?

আমিঃ ব্যক্তিগত বিষয়, তবে আল্লাহর রাসূল আমাদের বলেছেন ইসলামী জ্ঞানের কথা একজন থেকে আরেকজনের কাছে জানানোর জন্য। নিউটন যদি তাঁর গবেষণার কথা কাউকে না জানাতেন, তাহলে আজকে আপনি নিউটনের সূত্র জানতেন না।

কর্তাঃ আপনি কি তালেবান? মেয়েরা তাহলে কি করবে? ঘরে বসে থাকবে? পড়াশোনা করবে না?

আমিঃ আমি তালেবান না, এবং মেয়েদের পড়াশোনা অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু সহাবস্থান এর সুরাহা করতে হবে।

কর্তাঃ ইসলাম ১৪০০ বছর আগে নিয়ম। এই নিয়ম সংস্কার করার প্রয়োজন আছে।

আমিঃ প্রয়োজন নাই, কিন্তু আপনার অবৈধ ভাবে প্রবৃত্তির সুযোগকে বৈধ করতে চান, তাহলেই কেবল এ ধরণের সংস্কারের কথা আসে।

আর কোন প্রগতিবাদীকে দৃষ্টিনতকরণকে মনের অনুদরতা বললেই বা কী, মানুষের সকল কাজের বিচার হবে তার অন্তরের নিয়্যাতের বা intention উপর ভিত্তি করে। পর্দা বিহীন কোন পর- মহিলার দিকে ১০০% কলুষমুক্ত দৃষ্টিপাত এককথায় অসম্ভব। সে কারণে আল্লাহর রাসুল কখনো পর-নারীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করতেন না। আর আজকাল আমাদের সমাজে, বিশেষ করে চাকুরীক্ষেত্রে অহরহ পাশ্চাত্যের অনুকরণে নারী-পুরুষের করমর্দন বা হ্যান্ডশেকও প্রচলিত হয়ে যাচ্ছে। এ কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হল, পাশ্চাত্যের open culture অনুকরণের মাধ্যমে ইভটিজিং বন্ধ বা কমতে পারে না, কেবল বাড়তেই পারে।

আর প্রতিটি মুসলমানের “ফাহশা” বা অশ্লীলতা সম্পর্কে প্রচণ্ড সচেতন থাকা উচিত। এই ইভটিজিংকে আমি বলব এক ধরণের অশ্লীলতাও। শয়তানের কুমন্ত্রণায় অশ্লীলতা আজকাল এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, এটাকে এক ধরনের মানসিক বিকার বা অসুস্থতা বলা যেতে পারে। তাছাড়া অশ্লীলতার আরেকটি কুফল হল অশ্লীলতার সাথে জড়িতদের “self-esteem” ও “confidence” হ্রাস পাওয়া, যা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত। আমরা যদি অশ্লীলতা বন্ধ করতে না পারি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম হবে “self-esteem” ও “confidence” বিহীন, যার পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ অনেকবার আমাদের এ সম্পর্কে সচেতন ও সাবধান করেছেন । কিন্তু আমরা আজ ইসলাম থেকে অনেক দূরে। তাই আল্লাহর এই সতর্কবানী আমাদের এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে যায়। অন্তরে কোন রেখাপাত করে না। আমাদের রাসূল (স)ও সাহাবী (র) রা যখন কুরআন তেলাওয়াত করতেন, তখন আল্লাহর কোন সতর্কবানী তেলাওয়াতের সাথে সাথে উনাদের অশ্রু ঝরত। কারণ আল্লাহর একটা আদেশ তাদের মনে এমনভাবে রেখাপাত করত, যে আল্লাহর প্রতিটি নির্দশকে তাঁদের কাছে পিঠের উপর সাক্ষাত বেত্রাঘাত স্বরূপ মনে হত।কিন্তু আফসোস, আমাদের মাঝে সেই আল্লাহ ভীতির আর কোন ছিঁটেফোঁটাও অবশিষ্ট নাই।

ত ভাইয়েরা আমার, আসুন আজ থেকেই কঠোর কণ্ঠে না বলি ইভটিজিংকে। সকল অসুন্দর, অশিষ্টতা, বিকৃত রুচিকে মন থেকে ঘৃণা করি। প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য অনুধাবন করি আল্লাহ ও তার রাসূলের পবিত্র বাণীকে। অনুধাবন করি ইভটিজিং করার কারণে পরকালের ভয়াবহ শাস্তিকে। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সকলকে তোমার জীবন বিধান ও তোমার রাসূলের দেখানো পথে চলার তওফীক দান কর। আমীন!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s