নির্মমতা

সেই শিশু কাল থেকে পড়ে আসছি, মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে প্রথমটিই হল খাদ্য। কারণ খাদ্য ছাড়া এই পৃথিবীর কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। বড়লোকের ছেলে-মেয়েদের যেমন ক্ষুধা লাগে, বস্তির ছেলে-মেয়েদেরও তেমন ক্ষুধাই লাগে। তেমনি ক্ষুধা লেগেছিল উপরের দুটি মেয়ে শিশুর। কিন্তু কেউ তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করে নি। বাধ্য হয়ে তারা খাবার চুরি করতে গিয়েছিল। কিন্তু ধরা পড়েছে। অভাগা যেদিকে তাকায়, সাগর শুকায়ে যায়। পেটের দায়ে চুরি করতে আসা চোরের উপর হাজী মুহম্মদ মহসিনের করুণা হয়েছিল। তিনি চোরকে তার পরিবারের খাবার কেনার জন্য টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু এই দুটি ক্ষুধার্ত, গরিব শিশুর জন্য করুণা করার একটি লোকও পাওয়া যায়নি। বরং তাদেরকে চুরির দায়ে মারার মত পাষণ্ড পাওয়া গেছে অনেক।

আমরা আজ খুব বেশি স্বার্থপর হয়ে গেছি। অন্যের জন্য চিন্তা করার একটা মুহূর্তও নেই। আমরা আজ সবাই শুধু নিজেকে নিয়ে চরম ব্যস্ত। এই গরিব দুঃস্থদের জন্য চিন্তা ভাবনা বড়োজোর ব্লগ, ফেসবুক, বা সংবাদপত্রের কলাম পর্যন্ত  সীমাবদ্ধ থাকে।

এই স্বার্থপরতাকেও আমি মাফ করতে পারতাম, যদি অন্তত আমাদের সমাজে এই দুটি গরিব শিশুর উপর হাত তুলতে পারে এরকম একজন পাষাণ মানুষও না দেখতাম।

কিন্তু  পাষণ্ডের অভাব হয়নি। বরং করুণা করার জন্য একটা মানুষও এগিয়ে আসেনি।  এগিয়ে যেহেতু আসেনি, তাই আমি আমাদের স্বার্থপরতাকে ক্ষমা করতে পারছি না।

আইয়্যামে জাহেলিয়াতের মত পাষাণ মানুষ নাকি আর হবে না। তবে আমার এই বাংলাদেশের মানুষের বর্বরতা দেখে মনে হয়, আমারা সম্ভত সেই বর্বরতার যুগকেও হার মানিয়েছি।

লিমনের কাটা পা (ছবিঃ প্রথম আলো)

আমরা সবাই স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। আর আমারা যারা বয়সে এখনো তরূণ, তাদের স্বপ্ন দেখার মাত্রাটা আরেকটু বেশি। আমার মত উপরের ছবির এই ছেলেটি, যার নাম লিমন, সেও স্বপ্ন দেখত। স্বপ্ন দেখত পড়াশোনা করে একদিন তার দুঃখী বাবা-মায়ের কষ্ট দূর করবে। স্বপ্ন দেখত একদিন সেও পড়াশোনা করে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়বে। তবে লিমনের স্বপ্ন আর কোনদিন পূরণ হবে না। কারণ র্যা ব নামক এক আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (নাকি হানাদার বাহিনী) কোন কারণ ছাড়াই লিমনের এক পায়ে গুলি করেছে । অপারেশন করে ডাক্তাররা লিমনের পা কেটে ফেলে দিয়েছেন। লিমনের আজ এক পা নেই। অনেক সময়ই বাস্তবতার আঘাতে আমাদের স্বপ্ন গুড়ো হয়ে যায়, কিন্তু আশার শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যায় না। সেই আলোটুকু থাকে বলেই আমরা বেঁচে থাকি এবং নতুন উদ্যমে শুরু করতে পারি। কিন্তু লিমনের সেই আলোটুকুও কেড়ে নেয়া হয়েছে। যেখানে আজ লিমনের একটি পা-ই নেই, সেখানে নতুন উদ্যমে শুরু করার প্রাণশক্তি কি লিমন ফিরে পেতে পারে? স্বপ্নবিহীনভাবে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। তবে লিমনের বেঁচে থাকতে হবে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৈরি করা হয় দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালনের জন্য। কিন্তু আমাদের দেশে টাকা পয়সা দিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে পোষা হয় মূলত শোষণের বিরুদ্ধে পিঠ ঠেকে যাওয়া জনগণকে ডান্ডাপেটা, এবং প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করার জন্য। এইসব লাঠালাঠি এবং ক্রস ফায়ারের অনেক সময়ই একটা দায়সারা ব্যাখ্যা দেয়া যায়, কিন্তু লিমনের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, সেটির কোন ব্যাখ্যা নেই। লিমনের সত্যবাদিতা নিয়ে আমি নিঃসংশয়; কারণ লিমনের চোখের পানি এবং সারল্যই তার সত্যবাদিতার প্রমাণ। যেহেতু কোন এনকাউন্টার হয়নি, সেখানে র্যা বের পুলিশ লিমনকে কী কারণে গুলি করল, তা আমি ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। লিমন নামে যদি কোন সন্ত্রাসী থেকেই থাকে, তাহলে ত অন্তত বিচার করে তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করা দরকার ছিল। নাকি এই ধরণের গুলি করা র্যা বের পুলিশদের খামখেলিয়াপনা?

এই সব প্রশ্নের জবাব জানতে ইচ্ছে করে, তবে যেটি আরো বেশি জানতে ইচ্ছে করে, সেটি হল র্যা বের সেই পুলিশটি কি মানুষ কিনা। তার যদি বিবেক বলে কিছু থাকে, তার ভেতর যদি মনুষ্যত্ব বলে কিছু থাকে, তাহলে সে কিভাবে একটি নির্দোষ মানুষের পায়ের উপর গুলি করতে পারল? তার ভেতরটা কি একটুও কাঁপল না?

এক ছোট শিশুর মৃত্যুর পর বিএনপির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বাবর সাহেব বক্তব্য দিয়েছিলেন, “আল্লাহর মাল আল্লাহয় নিয়ে গেছে”। বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা ম্যাডাম এখনো এই ঘটনায় বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পান নি। বেফাঁস কথা বলে বিপাকে পড়ার চেয়ে, বক্তব্য না দেয়াই উত্তম।

তবে হ্যাঁ, এই সব বক্তব্য দেয়া আর না দেয়া সমার্থক। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আশা দিয়েছেন যে দরকার হলে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। র্যা ব তাদের তদন্ত করছে। মানবাধিকার কমিশন তাদের কাজ করছে। সাংবাদিকেরা তাদের কলাম লিখছেন। আমি আমার দু’কলম লিখেছি। পাবলিক কিছু র্যা ব বিরোধী আওয়াজ দিচ্ছে।

কিন্তু লিমনের আশার শেষ আলোটি যেরকম মিলিয়ে গেছে, সেরকম কয়েকদিন পর শেষ হয়ে যাবে তদন্ত, সাংবাদিকদের কলমের কালি, ও পাবলিকের আস্ফালন। বন্ধ হয়ে যাবে বিচার বিভাগের নড়াচড়া এবং নিস্তেজ হয়ে পড়বে মানবাধিকার কমিশন। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ব আমার জীবন নিয়ে। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে সবার জীবন নিয়ে। জীবন চলতে থাকবে। তবে লিমনের জীবনটা চলবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

এক পায়ে জীবনটাকে বহন করা এমনিতেই হবে অনেক কষ্টের। কিন্তু জীবনের ভার ছাড়াও লিমন আজীবন বয়ে চলবে পা-হারানোর কষ্ট ও বেদনা নিয়ে। পা হারানোর এই অপূর্ণতা, এই শূণ্যতা এতই গভীর যে এই পৃথিবীর কোন কিছুই সেই অপূর্ণতা বা শূণ্যতাকে পূরণ করতে পারবে না। পা হারিয়ে লিমনে্র হৃদয়ে যে ছিদ্র হয়েছে, এই পৃথিবীর সমস্ত ভালবাসাও সেই ছিদ্র বন্ধ করতে পারবে না।

***

মাঝে মাঝে সুপারম্যান হতে ইচ্ছে করে। কোথাও কোন জুলুম দেখলেই যাতে প্রতিরোধ করতে পারি। কিন্তু আমি কোন সুপারম্যান নই। আমি একটা কাপুরুষ। দুটি গরিব শিশুকে বলার কোন ভাষা আমার নেই। কোন ভাষা এই বর্বরতার জবাব দিতে পারে না। পাশাপাশি কোন ভাষা ও ভালোবাসাও  আজ লিমন এবং লিমনের মা-বাবাকে একটু স্বস্তি দিয়ে পারবে না।  তবে আল্লাহ এবং শেষ  বিচারের দিনের উপর যারা বিশ্বাস রাখে, তারা নিশ্চিত থাকুনঃ আমাদের রব আল্লাহ সেই দিন কড়ায়-গণ্ডায় এই সকল জলুমের সম্পূর্ণ ন্যায় বিচার করবেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s