পেছন ফিরে দেখাঃ স্কুল জীবনের বিচ্ছিন্ন অনুষঙ্গ

[গোপনীয়তা রক্ষার উদ্দেশ্যে কোন নাম ব্যবহার করা হয় নি]

অনুষঙ্গ ১

আমাদের ইংরেজির এক শিক্ষক কোন ছাত্রকে কান ধরতে বললেই বলতেন, “কান এভাবে ধরলে হবে না, টাইট করে ধরো।” পাশের বন্ধুকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার সবাইকে টাইট করে কানে ধরতে বলে কেন?” বন্ধু বলল, “স্যার মুরগির রান টাইট করে ধরে খায়, এই জন্য।”

অনুষঙ্গ ২

আমার বন্ধুর এক হুজুর, যিনি আবার আমাদের স্কুলের ট্রান্সপোর্ট সেক্রেটারিও হয়েছিলেন, খুব কাটাকুটি করে দাড়ি রাখতেন। কাটাকুটি করে দাড়ি আমার পছন্দ না; আমার পছন্দ ছাড়া দাড়ি। সেই হুজুর সাহেব একদিন বক্তব্য দিচ্ছিলেন। হুজুরেরের শিষ্যকে, মানে আমার বন্ধুকে, জিজ্ঞেস করলাম, “তোর হুজুর এইভাবে স্টাইল করে কেন দাড়ি রাখে?” বন্ধুর চটপট উত্তর, “হুজুর কি তোর কথা মত দাঁড়ি রাখবে? এই স্টাইল হুজুরের বউয়ের কাছে সেক্সি লাগে, এই জন্য এই ভাবে রাখে।”

অনুষঙ্গ ৩

তখন মনে হয় চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। যেহেতু প্রশ্নপ্রত্র ছাপানোর দায়িত্ব থাকত স্কুলের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের,  পরীক্ষা শুরুর আগে সেজন্য তিনি প্রতি ক্লাসে এসে জানতে চাইতেন ক্লাসে মুসলিম ব্যতীত অন্য ধর্মাবলম্বী কেউ আছে কিনা। তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রদের কাছে তিনি যখন জানতে চাইলেন যে তাদের ক্লাসে ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের কেউ আছে কিনা, একজন ছাত্র বলল, “স্যার আমাদের ক্লাসে একটা হিন্দু আছে।” স্যার বললেন, “লিস্টে সবার নাম ত দেখি মুসলমান, হিন্দু কে?” স্যারকে জানানো হলো যে একজন ছাত্রের মুসলমানি হয় নি, এবং সে কারণে তাকে হিন্দু হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

অনুষঙ্গ ৪

জামায়াতে ইসলাম্পন্থী এক স্যারের ছাত্র মসজিদে এসে এত দ্রুত নামাজ আদায় করত যে নামাজে সুরা-কিরাত এত তাড়াতাড়ি কিভাবে পড়ে, বোঝা সম্ভব ছিল না। বিরক্ত হয়ে স্যার একদিন নিজের ছেলেকে বললেন, “তুই কী নামাজের সুরা-কেরাত আগেই পড়ে রাখস? মসজিদে এসে কী খালি প্রাকটিস দিস নাকি?”

স্যারের মন্তব্যটি শ্লেষাত্মক; তবে এই মন্তব্য আমাদের নামাযের করুণ দুর্গতিকেই প্রকাশ করে।

অনুষঙ্গ ৫

নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের এক স্যার ছিলেন খুব দিল-দরাজ। এত উদারতা এবং মহানুভবতা কিভাবে অর্জন করেছেন জানতে চাইলে স্যার বলেছিলেন, ”একটা কথা মনে রাখবা, শিক্ষক হয় দুই রকমের। একদল-যারা জীবনে কষ্ট করে পাস করছে, টাইনা-টুইনা নম্বর পাইছে, তারা নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে হয় কসাই। আর আরেকদল হয় আমার মত। জীবনে কোন দিন ফেইল করি নাই, নম্বরও পাইসি বহুত। তাই আমি দিল দরাজ, ছাত্রদেরও বস্তাভরে নম্বর দেই, কোন কিপ্টামি করি না।”

কোন কোন শিক্ষকরা নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে কসাই কেন হয় আর কোন কোন শিক্ষকেরা দিল-দরাজই বা কেন হয়, এই গল্প থেকে তা জানা গেল।

অনুষঙ্গ ৬

প্রথম বন্ধু দ্বিতীয় বন্ধুকে, “ফাজলামি বন্ধ কর; নউলে তরে এমন জায়গায় মারমু যে জীবনে তোকে আর কেউ কোনদিন বাপ ডাকবে না।”

অদৃষ্টের কি পরিহাস, দ্বিতীয় বন্ধুই সব বন্ধুর আগে বিয়ে করে ফেলেছে। হয়ত ত বা বাবাও হয়ে যাবে সবার আগে।

অনুষঙ্গ ৭

বেশ গরম পরার পরও এক স্যারকে প্রায়ই কোট পরে আসতে দেখে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যারের কি গরম লাগে না? এত গরমে কোট পরে আসে কিভাবে?”

বন্ধুঃ আরে দেখস না স্যারের ভুরি কিভাবে সামনে বাড়তেছে, তাই কি আর করবে, যতদিন সম্ভব কোটকেই ‘ভুড়ির হিজাব’ হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়াস চালাচ্ছে।

কোটের ব্যবহরের নতুন মাত্রা শিখেছিলাম সেদিন। আল্লাহ না করুক, ভুড়ি টুড়ি বাড়লে এই ট্রিক্স কাজে লাগতে পারে।

অনুষঙ্গ ৮

আমরা আমাদের স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের কাকু ডাকতাম। একদিন এক কাকু ক্লাসে এসে স্যারকে বলল, “প্রিন্সিপ্যাল স্যারে আপনারে সালাম পাঠাইছে।”

এই সালাম পাঠানো বাক্যাংশের মানে প্রথমে জানতাম না। পরে অবশ্য এর অর্থ জেনেছিলাম। “প্রিন্সিপ্যাল স্যার আপনাকে ডাকছেন” কথাটি নাকি আমাদের নতুন অধ্যক্ষ স্যারর পছন্দ হয়নি; এর বদলে সেজন্য তিনি অপেক্ষাকৃত ভদ্র বচন “স্যার আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন” এর প্রবর্তন করেন।

“স্যার আপনাকে ডাকছেন” শব্দ সমষ্টির মধ্যে অভদ্রতার কি আলামত ছিল তা এখনো বুঝতে পারি নি, তবে নতুন প্রশাসন আসলে কারণ ছাড়াই যে নিয়ম নীতির পরিবর্তন হতে পারে, সেটা ভাল মত বুঝতে পেরেছি।

অনুষঙ্গ ৯

আমিঃ গতকাল তোর আন্টির বাসায় দাওয়াত কেমন খেয়েছিস?

বন্ধুঃ আর বলিস না, গরুর মাংসে এমন ঝাল দিয়েছিল যে এখন পা* দিলেও ঝাল পা* আসে।

(পা* = ফার্ট)

অনুষঙ্গ ১০

পদার্থ বিজ্ঞানের কিছু কঠিন অঙ্ক করতে করতে বিরক্ত হয়ে এক বন্ধু বলেছিল, “এতদিনে বুঝলাম মহান আশরাফুল কোন দুঃখে ক্রিকেট খেলে।”

অনুষঙ্গ ১১

বন্ধু ১: মোটা হয়ে যাচ্ছি রে দোস্ত 😦

বন্ধু ২: তোর মৃত্যুর পর তোর লাশ তুলতে মানুষের যত বেশি কষ্ট হবে, তোর জীবন তত বেশি সার্থক বলে গণ্য হবে। সুতরাং মোটা হলে চিন্তার কিছু নাই।

বন্ধুর এই জ্ঞানগর্ভ যুক্তি ‘জীবনের সার্থকতা’ বিষয়ক অজ্ঞানতা থেকে মুক্তি দিয়েছিল।

অনুষঙ্গ ১২

একদিন জোহরের নামাজের আগে অজু করার জন্য বাথরুমে ঢোকার পর বাথরুমের জঘণ্য অবস্থা দেখে স্যার খেদোক্তি করলেন, “আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা খাল-বিলের মধ্যেই প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারত। আমাদের জিনের মধ্যে সেটাই রয়ে গেছে। বাথরুমের এটিকেট আমরা শিখব কিভাবে?”

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s