হুমায়ূন আহমেদকে খোলা চিঠি

জনাব হুমায়ূন আহমেদঃ

বাংলা উপন্যাসের সাথে আমার পরিচয় হয় আপানার ‘পোকা’ উপন্যাস পড়ার মাধ্যমে। ‘পোকা’ আমার জীবনে পড়া প্রথম উপন্যাস।  তখন  আমি ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। আমাদের ক্লাসে তখন সবাই আপনার উপন্যাস পড়ত নেশার মত। এরপর দ্বিতীয় যে উপন্যাসটি পড়েছিলাম, তার নাম ছিল ‘দারু চিনি দ্বীপ’। তারপর আরো অনেক উপন্যাস পড়েছি। পড়তে পড়তে কোন শব্দগুলো আপনার উপন্যাসে প্রায়ই থাকত তার একটা তালিকাও তৈরি করেছিলাম। তালিকার কয়েকটি শব্দ এখনো মনে আছে। এগুলো হল, “বিসমিল্লা রেস্টুরেন্ট, লেবেন্ডিস, নাদান…।”

সময়ের সাথে মানুষ বদলে যায়। “মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে বদলায়, অকারণেও বদলায় (মুনীর চৌধুরীর এই উক্তি হুবহু উদ্ধৃত করতে পেরেছি কিনা সন্দেহ আছে)।” আমি সেরকম বদলে গেছি। কিছু কারণে বদলে গেছি, কিছু অকারণে বদলে গেছি। আজকাল আর উপন্যাস পড়তে ইচ্ছা করে না। কিন্তু তারপরও আপনার কিছু বই এখনো রয়ে গেছে। ফেলে দেই নি। উপন্যাস না পড়লেও আপনার লেখার স্টাইলের প্রতি এক ধরণের admiration রয়ে গেছে। এত সহজ সরল ভাবে আপনি মানুষের জীবন প্রবাহ বর্ণনা করতেন, মনে হত, “কলম ধরলে ত আমিও এভাবে লিখতে পারব।” তবে কলম ধরার পর দেখি  যে আপনার মত সাবলীল ছন্দে লিখতে পারছি না।তবে মাঝে মধ্যে বাংলায় লেখালেখি করার সময় এখনো সজ্ঞানে আপনার স্টাইলে লেখার চেষ্টা করি।

সহজভাবে একটি কথা বলার জন্য আজকে এই খোলা চিঠি লিখছি আপনাকে। তবে সহজ কথা অনেক সময় জটিলভাবে বলতে হয়। তবে আমি এখানে অন্তত সংক্ষিপ্তভাবে বলার চেষ্টা করব।

আপনার উপন্যাস পড়ে আমার মনে হয়েছে, মৃত্যু নামক ব্যাপারটার প্রতি আপানার আগ্রহ রয়েছে, বিশেষ করে মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে। মৃত্যু পরবর্তী জীবন কেমন হতে পারে তার বিভিন্ন কাল্পনিক বা মনগড়া বর্ণনা আপনি আপানার কয়েকটি উপন্যাসে দিয়েছেনও। একই সাথে আপনি আবার বিভিন্ন জায়গায় মানুষের কম আয়ু নিয়ে আফসোস প্রকাশ করেছেন। আপনার মতে, মানুষের মত বুদ্ধিমান প্রাণীর কমপক্ষে ৫০০ বছর বাঁচা উচিত। সর্বশেষ আমেরিকা সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে প্রথম আলোর কাছে দেয়া সাক্ষাতকারে আপনি বলেছেন যে আপনি বিশ্বাস্ করেন মানুষ একসময় বিজ্ঞানের মাধ্যমে মৃত্যুকে জয় করতে পারবে। আপনার প্রকাশিত ধারণাগুলো contradictory। একদিকে আপনি মৃত্যু পরবর্তী জগত সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, আবার একই সাথে মৃত্যুর প্রতি আপনার অনীহাও রয়েছে। কোন দিকের পাল্লা ভারী? আপনার মতামতে এই স্ববিরোধিতা কেন প্রকাশ পেয়েছে?

আজ আমরা ভোগবাদী জীবনে অভ্যস্ত। ভোগবাদী জীবন ব্যবস্থার প্রধান বাধা হল জবাবদিহিতা এবং মৃত্যু। এজন্য ভোগবাদী সমাজে মৃত্যু বা জবাবদিহিতা নিয়ে কখনো কোন কথা বলা হয় না। আমি নিজে আমেরিকানদের সাথে মৃত্যু নিয়ে কথা বলার অনেক চেষ্টা করেছি। কখনো একজনকে পাই নি যিনি মৃত্যুর বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন। তাদের মানসিকতা হল, “Don’t you have something better to talk about? Let’s not talk about that thing now. Enjoy life.” কিন্তু কোন বিষয় যখন সুনিশ্চিত, তখন আপনি সেই বিষয়টিকে অস্বীকার করতে পারবেন না, বড়জোড় ভুলে থাকতে পারবেন। ভুলে থাকার জন্য আপনাকে আপনার চারপাশে একটি delusional layer তৈরি করতে হবে। আজ আমরা ভোগবাদীরা আমাদের চারপাশে সেই আস্তরণ তৈরি করছি। কারো জন্য সেই আস্তরণ হল ক্ষমতা। কারো জন্য টাকা-পয়সা। একেক ভোগবাদীর জন্য আস্তরণটা একেক রকম।

কিন্তু সমস্যা হল, এই আস্তরণে একটা ফুটো রয়েছে। এই ফুটোর নাম হল conscience। খরগোশ যখন শিকারির সামনে ধরা পরে, তখন মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও চোখ বন্ধ করে একধরণের সান্ত্বনা পেতে চায়। খরগোশ ভাবে, আমার সামনে ত কেউ নেই। কিন্তু এই সান্ত্বনা কি খরগোশকে কোন সান্ত্বনা দিতে পারে? পারে না। কারণ তার এই সান্ত্বনায় একটা ফুটো রয়েছে এবং সেই ফুটোটা হল তার বাস্তব পরিস্থিতি। তেমনি আল্লাহ প্রদত্ত যে conscience আমাদের রয়েছে, সেই conscience এর কারণে এই delusional layer আমাদের কোন শান্তি দিতে পারে না। খুন করা অপরাধ এটা প্রমাণের উপায় নেই, কিন্তু প্রত্যেকেই জানে যে খুন করা ঠিক নয়। তেমনি আমরা আমাদের conscience থেকে জানি যে আমাদের কর্মের জবাব দিতে হবে এবং পরিণতি ভোগ করতে হবে। এই জন্য শ্রেষ্ঠ ভোগবাদী জীবনের layer থাকার পরও আমাদের মনের মধ্যে একটা খচখচানি থেকেই যায়।

আপনি জ্ঞানী মানুষ। তবে যখন ভোগবাদী জীবনের মায়া প্রকট হয়েছে, তখন “মানুষের ৫০০ বছর বাঁচা উচিত” বা “মানুষ মৃত্যুকে জয় করবে” বলে মতামত দিয়েছেন। তবে ভোগবাদী জীবনের মায়া নিশ্ছিদ্র নয়; এই ছিদ্রের মধ্য দিয়ে যখন মৃত্যুর বাস্তবতা উঁকি দিয়েছে,তখন বাস্তবতাকে আলিঙ্গনের তাগিদ থেকে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে কি আছে তা জানার জন্য আগ্রহের উদ্রেক হয়েছে। তবে মৃত্যু থেকে পলায়নপর মানসিকতা শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়েছে। সেকারণে মৃত্যু পরবর্তী জীবন কল্পকাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

তবে এখন আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনি কি এই পলায়নপর মানসিকতা নিয়ে জীবন-মৃত্যুর সীমানা পাড়ি দিতে চান? নাকি প্রস্তুতি নিয়ে, জেনে শুনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চান?

যদি দ্বিতীয় পন্থা অবলম্বন করতে চান, তাহলে তওবা করে, ইসলাম সম্পর্কে আকীদা শুদ্ধ করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসেন। যত শীঘ্র সম্ভব।

আমার চিঠি পড়ে আপনি হয়ত ভাবতে পারেন যে আমি ধরেই নিয়েছি যে আপনি আর বাঁচবেন না। না, আমি সেরকম কিছু মনে করি নি। কঠিন ব্যাধি নিয়েও মানুষ অনেক বছর বেঁচে থাকতে পারে। আবার সুস্থ মানুষও কোন দুর্ঘটনায় মারা যেতে পারে। যেহেতু কেউ জানে না কার মৃত্যু কখন হবে, তাই আল্লাহর পথে ফিরে আসার ব্যাপারে procrastination মোটেই কাম্য নয়।

এই নাদানের চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কিনা জানি না, তবে আমি চাই এবং দোয়া করি এই চিঠিটা যেন আপনার কাছে পৌঁছে। পৌঁছালেও আপনার প্রতিক্রিয়া কি হবে? আপনার মেয়ের হিজাব পরা দেখে আপনার প্রতিক্রিয়া ছিল, “কেয়া বাত হ্যায়।” আশা করি এবং দোয়া করি আমার চিঠির জবাবে আপনার প্রতিক্রিয়া সেরকম হবে না।

বিনীত,

আল্লাহর-শার্দুল

2 thoughts on “হুমায়ূন আহমেদকে খোলা চিঠি”

    1. Wa alykumus salam wa rahmatullah brother.

      Jazakhallah khair for bringing these links to my notice. Kalamullah.com is an excellent source of Islamic knowledge. I have downloaded many books from this website, but never noticed that there were books in Bengali.

      BTW, I would appreciate if you can keep the comments pertinent to the post. Thank you once again for dropping by and jazakhallah khair.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s