সঙ্কলিত পোস্ট – সাফওয়ানের ব্লগ থেকে

আমার সোনার বাংলা ওয়েবসাইটের ব্লগার সাফওয়ানের দুটি লেখা আজ চোখে পড়েছে, যেগুলো পড়ে মনে হল অনেক দিন পর শুভ বুদ্ধির কোন মানুষের লেখা পড়ছি। বাংলায় প্রকাশিত নিবন্ধ বা ব্লগ পোস্ট পড়া আমি প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কারণ বাংলা লেখা আজকাল যেখানেই পড়ি, সেখানেই শুধু পাই বিশেষ কয়েকটি বিষয়ঃ মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, তথাকথিত আধুনিকতা ও মুক্ত চিন্তা, গণতন্ত্র, ইসলাম বিদ্বেষ ইত্যাদি ইত্যাদি। এসকল বিষয়ের আড়ালে যে জিনিসটি আমি সবসময় প্রত্যক্ষ করতাম, তা হল hypocrisy বা মোনাফেকী। সাফোয়ানের দুটো লেখা পড়ে এজন্য ভাল লাগছে যে দুটো লেখাই আমাদের সমাজে বিদ্যমান মোনাফেকীর বিরুদ্ধে কথা বলেছে।

সাফওয়ানের ব্লগের ঠিকানা হলঃ  http://www.sonarbangladesh.com/blog/safwan/

সাফওয়ানের ব্লগ থেকে লেখা দুটো নিচে ক্রস পোস্ট করা হল।

_____________________________________________________________

বিষণ্ণ তারুণ্য, মুগ্ধ কৈশোর

পোস্টের উৎসঃ http://www.sonarbangladesh.com/blog/safwan/137249

সাহিত্য টাইপের আলাপ করিনা এখন। অথচ সাহিত্য যেন একসময় রীতিমতন পানির সাথে গুলেই খেতাম। শরৎবাবুর উপন্যাস নিয়ে অনেকগুলো রাতে ঘুমাতে গেছি, বহুদিন শ্রীকান্তের সাথে লম্বা লম্বা পথ পাড়ি দিয়েছি। পথের দাবী পড়তে গিয়ে অনেকবার প্রতিবাদী হয়ে সমাজকে সমান করে দেবার স্বপ্ন দেখেছি। মেজদিদির চোখের জল মুছে দিয়েছি মনে মনে অনেকবার, কেঁদেছি বড় দিদির জন্য — সে-ই আমার কৈশোর! সেই কিশোর মুগ্ধ আত্মায় ক্যাপটেন হ্যাটেরাসের সাথে মেরু অভিযানে গিয়েছে, ক্যাপটেন নিমোর সাথে সাগরতলে গিয়েছে, লাবন্য আর অমিতের চিঠি-কবিতায় উদাস হয়ে অমিত হয়েছে। কল্পনার লাবন্যকে কতশত চিঠি যে কেবল লিখে খসড়া হয়েছে তার হিসেব নেই। নৌকাডুবির হেমনিলিনীর কথা ভেবেও কষ্ট লাগে এখনো। লা মিজারেবলের জাঁ ভালজার কথা পড়ে কেঁদে বইয়ের পাতা ভিজিয়ে ফেলেছিলাম। রবিনসন ক্রুসোর সাথে দ্বীপে আমি মানুষখেকোদের আতঙ্কে লুকিয়ে থেকেছি একটানা অনেকদিন গুহার ভেতরে।

আমার কৈশোর ছিলো মুগ্ধতায় ভরপুর। জুলভার্নের সাথে জল-স্থল-অন্তরীক্ষে ভ্রমণ করেছি, কখনো হুমায়ূন আহমেদ, কখনো শরতচন্দ্র, কখনো রবীন্দ্রনাথের কবিতা, কখনো জীবনবাবুর সাথে ধানখেতের পাশে বকের ওড়াওড়ি, জোনাকপোকার জ্বলে যাওয়া, কখনো আর্থার কোনান ডয়েলের জগতে ওয়াটসন আর শার্লক হোমসের সাথে গিয়েছি রহস্য সমাধান করতে। এসব অনুভূতিদের সেই আবেগ অকৃত্রিম, মানবিক, ভালোবাসার ছিলো।

সেই কৈশোর বিদায় নিয়েছে অনেক বছর হলো। ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বয়সানুযায়ী সময়ের পার্থক্যগুলো বলো। ধারণা পেয়েছিলাম, ১২ থেকে ১৮-১৯ মনে হয় কৈশোর। ২৫ অবধি তারুণ্য। যৌবন এর পরেই। যৌবন মানেই জীবনের শেষ দিকে পদার্পণ। অর্ধাংশ শেষ। প্রৌঢ় পুরুষ তার সন্তানের ভরণপোষণের ব্যবস্থায় জীবন ব্যয় করে, বার্ধক্যে গুণে মৃত্যুর প্রহর…

মানুষের জীবনপ্রবাহ এমন অনেকটাঃ
শৈশব –> বাল্য –> কৈশোর –> তারুণ্য –> যৌবন –> প্রৌঢ় –> বার্ধক্য

শৈশবের পরে কৈশোরে এসেই যেন সেই পড়ার জগত হারিয়ে গেলো। আমার সেই বইয়ের পাতাগুলোতে আর রোদের আলো পড়েনা, হাতের স্পর্শও পড়ে না। তখন থেকে জীবনে বড় বড় পরীক্ষা এলো। মানুষ হতে হবে, বড় হতে হবে তাই মা-বাবাকে ছেড়ে দূরে পড়তে গেলাম। শারীরিক যন্ত্রণায় নিজেকে কখনই নিজের মতন পেতাম না। পাপকে চিনতে শিখলাম, পাপাসক্তদের পাশে থেকে পাপাচারী হতে শিখলাম। কোথায় সেই শুভ্রতার ভালোবাসা, জীবন তো হারিয়েই গেলো। কেউ বুঝেনি তারপর, কেউ না। সবাই বিচার করে, স্কেল ধরে আমাকে মাপতে বসে। আমি আমার পুরোনো আমিকে হারিয়ে ফেলি।

অনেক জোর করে বছর দুই যাবার পর বিমল মিত্রের কড়ি দিয়ে কিনলাম হাতে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এবারের যাত্রা আমার হবেই, দীপঙ্করের সাথে সেই রেলের চাকুরি করতে গিয়েছিলাম। তার সাথেই রেলের কোয়ার্টারে থাকতে শুরু করেছিলাম। টার্ম ফাইনাল চলে এলো, স্যারের ঘৃণ্য নোংরা বাক্যগুলো বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল। কড়ি দিয়ে কিনলাম ফিরিয়ে রেখে এলাম। বিষণ্ণ তারুণ্যে আমার পাশে কেউ ছিলনা। বিষণ্ণ আমি তখনো আকাশের দিকে চেয়ে থাকতাম। লাল-নীল-ধূসরের রঙের বৈচিত্র্য আমার বিরক্তির কারণ দেখিনা। সেদিন আমার বোন যখন বললো, আকাশ দেখো, আকাশে আজ অনেক আলো, ভরা পূর্ণিমা। প্রচন্ড বিরক্তিতে বমি বমি ভাব উঠে এলো। আমার বইয়ের তাক ভরে থাকা সেই শত-শত পাতার বইগুলোকে আমি বড় অগ্নিকুন্ডে ফেলে দিতে পারব। এই জীবনযুদ্ধের সাথে এইসব সাহিত্যমাখা স্বপ্নের যোগসূত্র নেই। আশাও করিনা।

আমি নাহয় বললাম কৈশোর মুগ্ধতার, তারুণ্য বিষণ্ণ, আর যৌবন? যৌবন আমার ঘৃণার। প্রতিটি দিনে অজস্রবার নিজেকে ঘৃণা করি। নিজের সীমাবদ্ধতা আর অসহায়ত্বকে ঘৃণা করি। পত্রিকার শিরোনামে চেয়ে ঘৃণা করি দেশের মাথার লোকদের। বাসে উঠতে গিয়ে পেছনের পকেটের মানিব্যাগে প্রায়ই হাতের স্পর্শ পাই, নিজের হাত ওতে চেপে ধরে ঘৃণা করি লক্ষ মানুষের দারিদ্রকে। আকন্ঠ ঘৃণায় ডুবে থেকে বেঁচে থাকি। জ্ঞানহীন মূর্খ অথর্ব অভিভাবকগুলোকেও ঘৃণা করি — যারা সন্তানদের বড় করে জীবন পার করে দেন, বড় সব সিদ্ধান্ত নিতে ইতরের মতন গোঁ ধরে বসে থাকেন। সমাজ আর বংশের ট্রেডিশন রক্ষার নামে সন্তানদেরকে তাদের অগোচরের কুত্তা বানিয়ে ছেড়ে দেন, ওইরকম কুকুর আমি অনেক চিনি। শত শত জীবন্ত লালাঝরা কুকুর। ওইসব কুকুরকেও ঘৃণা করি আমি। আমার ঘৃণা হয় বিলবোর্ডের পেছনের ব্যবসায়ীদেরকে। ভ্যাসলিন বেচতে যারা ধবল নারীর কোমলতাকে প্রদর্শন করতে টপস পরিয়ে ১০০ গুণ বর্ধিত করে পথের ধারে টাঙ্গিয়ে দেন। একদিন তো তার স্ত্রী কন্যারাই বিবস্ত্র হবে রাস্তার ধারে, হবেই — এটা আবশ্যক পরিণতি!

ঘৃণা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ফিরে যাই পুরোনো স্মৃতিতে। আমার শৈশবে, ফেলে রেখে যাই ভালোবাসার কৈশোরকে। শৈশবের একটা স্মৃতি আছে। মরহুম নানীজানের ঘরে সন্ধ্যা হলেই চলে যেতাম। তার লেপের নিচে জায়গা পেতে মামাত ভাই আর আমার মাঝে প্রতিযোগিতা হত। ঢাকা থেকে যাবার কারণে, ক্লাসের ফার্স্ট থাকার কারণে সেইসময় জিতে যেতাম। অমন জয়ের পরিমাণ আমার জীবনে খুব কম। ভালোবাসা পেতে আমি চিরকাল পরাজিত। তবু নানীজানের আদরমাখা জড়িয়ে ধরা একটা সন্ধ্যার কথাই মনে পড়ে। তিনি যেদিন অজানার জগতে চলে আমাদের ছেড়ে যান, গ্রামের এমাথা ওমাথার সবাই কেঁদেছিল। অনাত্মীয় একজন ভাইকে হাউ-মাউ করে কাঁদতে দেখেছিলাম বড় খালামনিকে দেখে, খালামনির সাথে নানীর চেহারার অনেক মিল। সেই নানী এমনই মানুষ ছিলেন, কারো খেতে কষ্ট হলে তারা দুপুরে বিকালে তার হেঁশেলের পাশে এসে বসে পড়ত। নিজের খাবার দিয়ে দিয়ে না খেয়ে থেকেছেন বলে মেজ ছেলের বৌ তাকে অনেক বকা দিয়েছিল বলে গল্প শুনেছি।

আমি শীতের সময় গ্রামে যেতাম, ভোরের কুয়াশায় আম্মু বের হবার আগে সুয়েটার পরিয়ে দিতেন, কান ঢাকার একটা টুপি। আমি পায়ে রুপসা চপ্পল লাগিয়ে পেছনের দিকে চলে যেতাম বাড়ির। গরুর গাড়ির চাকার পাশে দাঁড়িয়ে বিশাল খড়ের গাদাগুলো দেখতাম, একেক বাড়িতে একেক উপায়ে সাজিয়ে রাখা হত। যেটা উচু করে সাজানো হত, যেন একটা ছোট টিলার মতন — সেইগুলো আমার বেশি ভালো লাগত। এই স্মৃতিচারণগুলোই আমার ঘৃণার মাঝে ভালোবাসার বাতাস বইয়ে দেয়। কেবল তখনই মনে হয়, হাবিব মামা আমাকে তেমনই এক সকালে ডেকে রোকেয়া মামির হাতে বানানো ভাপাপিঠা খাইয়ে ফেরত দিয়েছিলেন। আম্মু খুঁজতে এসে বকা দেয়ার মতন হতে মামা আমার হয়ে কথা বলেছিলেন। সেইসব স্মৃতিগুলো শুধুই নিখাদ ভালোবাসা। হাবিব মামা বদলে গেছেন, পরে রাজনীতিতে জড়িয়েছেন, উপজেলার নানান শত্রুতার খপ্পরে পড়ে অনেক বয়স নেমে এসেছে তার জীবনে। শেষবার দেখে কষ্ট লেগেছিল আমার। সেই শক্তপোক্ত মামাটি আর নেই।

নিখাদ সেই ভালোবাসার স্মৃতিরাই আমাকে মনে করিয়ে দেয় — জগতে এখনো অনেক ভালোবাসা হয়ত আছে, তারা আমাকে স্পর্শ করে না। আমি দেখতে পাইনা, আমার উপরে সেই ভালোবাসা এসে পড়ে না। তাই এই ঘৃণাময় যৌবনকেও আমি ঘৃণা করি। যৌবন কখনই সুন্দর কিছু না। এই পৃথিবীর এই সময়ে যৌবন হলো চিরন্তন ভোগান্তির পথের দরজা। কাম-ক্রোধ-ঘৃণা-অশ্লীলতা-মিথ্যা জড়িয়ে ধরে থাকে প্রতিটি যৌবনকে। আমরা সেই নোংরা যৌবনের প্রাণী। ঘুমানোর আগে মাঝে মাঝে ঝাপসা হয়ে মনে আসে রুনি আপুর কথা, বাবু ভাইয়ার কথা। তাদের কোলে আমি কয়েকবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম — শৈশবে। সেই স্নিগ্ধ স্পর্শের অকলঙ্ক ভালোবাসারা হয়ত আজো আছে পৃথিবীতে, আমি জানিনা। আমি হয়ত হতভাগা…

_____________________________________________________________

সমাজের ছেলেমেয়েদের শরীর-মনের চাওয়া, বিলম্ব বিয়ে এবং চিন্তা-প্রতিবন্ধী অভিভাবকদের কথা

পোস্টের উৎসঃ http://www.sonarbangladesh.com/blog/safwan/140716

ব্লগার মোহায়মেন ভাইয়ের কোন চোখ দিয়ে দেখবো পড়লাম ভোরে উঠেই। অসাধারণ ক’টা লাইন, ছোট্ট একটা পোস্ট — গভীর কিছু জীবনবোধের কথা। পথ চলতে গিয়ে চোখে অনেক কিছু ভেসে ওঠে আমাদের – সবাই একভাবে দেখে না। দেখার দৃষ্টি বদলায় চিন্তার ক্ষমতার কারণে। তার লেখাটা গভীর চিন্তার প্রতিচ্ছবি। কিছু কথা জমলো যা লেখা দরকার… যেই সমাজে বিয়ে কঠিন হয়, সেই সমাজে ব্যভিচার সস্তা হয়ে যায়… 

একটি উচ্ছ্বল তরুণী যখন অনেক সাজুগুজু করে একটা ছেলের হাত ধরে রাস্তায় উড়ে উড়ে চলে — তখন তাকে দেখলে কে কী মনে করেন জানিনা, আমার মনে হত অন্যকিছু। এই মেয়েটা অনেক প্রস্তুতি নিয়েই রাস্তায় বের হয়েছে, সাজুগুজু মেয়েরা অনেক সময় নিয়ে চিন্তা করে। কালার ম্যাচিং, ফিটিং এটা ওটা। এরপর রাতের বেলা একটা ছেলের হাত ধরে পার্কে হাঁটা। হয়ত বাবা-মা তখন ভাবছেন — মেয়েটা ঢাকায় পড়াশোনা করছে। অন্তত তারা অনেক বড়ো কিছু স্বপ্ন নিয়েই তাদের পাঠান শহরে। ঢাকার মধ্যবিত্ত মেয়েরা রাত ঘরে পথে ঘুরেনা সচরাচর। পরিবারগুলো একদমই বিকিয়ে যায়নি।

বিকিয়েছে সংস্কৃতি। প্রতিটি ঘরেই স্যাটেলাইন কানেকশন। হিন্দি নায়িকারা বিকিনি, টপস পড়ে নিজেদের শরীরের বিভঙ্গকে পুরোপুরি তুলে দেয় ক্যামেরার কাছে। সারাদিন সিরিয়ালে দেখা যায় সুন্দরী প্রদর্শনক্ষম মেয়েদের মূল্য, আকর্ষন। ‘সিক্সপ্যাক’ শব্দটা আগে শোনা যেতনা — এখন ছেলেরা প্যাক অর্জনের যন্ত্রণায় অস্থির থাকে। যতই জ্ঞানীগুণী আর হুজুরের পরিবার হোক, এখনকার কিশোর-কিশোরীরা এগুলো অবশ্যই অবশ্যই জানে –এগুলোই তাদের চারপাশ। তাদের এফএম রেডিও সারাদিনই প্রেমের গানে, প্রেমের আলাপে, লাভগুরুতে ভরপুর থাকে। ফ্রেন্ডসদের আড্ডাবাজির এসএমএস পড়ে শোনায়। যাদের কোন মেয়ে/ছেলে নাই “আড্ডা” মারার, “গল্প” করার, “পিকনিক” করার, “ফোনে কথা” বলার — তারা নিজেদের অসহায় ভাবতে বাধ্য হয়। পারিবারিক জ্ঞান বাবা-মা দিয়ে রাখলে সেক্ষেত্রেও তাদের যুদ্ধ হয় কঠিন যুদ্ধ। প্রতিদিন, অনেকবার। বয়ষ্করা এসব জানেনা, বুঝতেও পারবে না ভিতরে এসব কালচার কীভাবে কাজ করে, আমরাই পারিনা ঠিকমতন! মাত্র ১০বছর আগে অমন ছিলাম তাই অনেক ব্যাকডেটেড আছি!!

একটা ছেলে তার বন্ধুদের মাঝে গিয়ে শুধু গার্লফ্রেন্ডের আলাপ শুনে — তার কাছে মনে হতে থাকে, আমারো হয়ত থাকা উচিত ছিল। তার সামনে অকূল পাথার, নৈতিকতার সাথে যুদ্ধ। ক’দিন? শরীর আর মনের এই অমোঘ চাওয়ার সাথে ক’দিন যুদ্ধ? ১৬-১৭ তে পরিপূর্ণ বড় হয়ে যাওয়া ছেলেটি সামনে ১০ বছরের বেশি সময়ের নিরাশার দেখা খুজে পায়। বিয়ে হয় এখন ৩০ বছরে। আগে তাদেরই কেবল বিয়ে হয় — যাদের সম্পদ বেশি। এবং তারা প্রেম করে ধনী মা-বাবার ঘাড়ে উঠেই খরচা করে বিয়ে করে। তাহলে? ১৫ বছর এই ছেলেটা প্রতিটি দিন, প্রতিবেলা যুদ্ধ করে যাবে? আর বাবা-মা কখনই তাদের হয়ে ভাবেন না। আর সম্ভাবনার সীমানা দেখতে না পাওয়ায় তাদের “স্বাভাবিকভাবেই” হতাশা আগলে ধরে।

অনেক সুশীল ইতর লোক আছে — এমন আলোচনায় এসে টাকা ইনকামের প্রয়োজনীয়তার গল্প ফাঁদবেন। টাকা দিয়ে বিয়ে হয়না, চলার পথেও টাকার ব্যাপার যা — তার চাইতে অনেক বেশি স্বভাব আর চরিত্র। চরিত্রহীন সন্তান বা স্বামীর টাকা দিয়ে কারো কিছুই আসে যায় না। অথচ, এই টাকার দেখা, উপার্জনক্ষমতা তখন আপনার কাছে মূল্যহীন হবে, যখন আপনার সন্তান অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে বাসায় ফিরবে। হয়ত তাকে এই শহরের চিপায় চাপায় দেখা যাবে আর ক’দিন পরেই। তখন উপার্জন ধুয়ে পানি খেতে হবে এইসব বেকুব অভিভাবকদের।

পূর্বের প্রজন্মের পাপ, অলসতা, বুদ্ধিবৃত্তিক অসারতার খেসারত আমাদের নোংরা সংস্কৃতি। সেই অভিভাবকরা আবার সংস্কৃতির উত্তাপের কড়াইতে পরের প্রজন্মকে ভেজে ভেজে লবণ ছিটিয়ে দেন তাদের কথার বুলিতে। অভিভাবকরা তো তাদের উপযুক্ত শিক্ষা পাবেই — তারা কোনদিনই শান্তি পাবেন না অন্তরে — এইটা আমি হলফ করে বলতে পারি। বেকুবদের শান্তি পাবার অধিকার নেই। 

একটা ছেলে ভার্সিটি লাইফে ক্লাস করে ফিরে পরের দিন ল্যাব/কুইজ না থাকলে কি করে বাসায়/হলে? তার আশেপাশের সবই তার পশুত্বকে জাগিয়ে তোলার জিনিসপত্র। টিভি চ্যানেল, মুভি, নাটক, গান, পত্রিকা, টেলিভিশনের অ্যাড — সে যদি শুধুই যুদ্ধ করে। ঘরে শিক্ষা না থাকলে ফোনে মেয়েদের কাছে পৌছাতে চায়। রোমান্স আজকাল পথে ঘাটেই থাকে। ভ্যাসলিনের কোমলতা বুঝাইতে টপস পরা মেয়েদের বিলবোর্ডে দেখা যায়। নারীর উন্মুক্ত বগল প্রদর্শনী থাকে ডিওডোরেন্টের অ্যাডে — ধানমন্ডীর মূল রাস্তায়। বছরের পর বছর ‘ভালোবাসার টানে, পাশে আনে’ — বিলবোর্ডে ছেলের বুকে একটা মেয়ে মাথা রেখে হেলান দিয়ে থাকে বিশাল মাঠের ঘাসে। আর এসব থেকে বছরের পর পছর একটা ছেলে যুদ্ধ করতে থাকবে — তাকে অভিভাবকরা সন্নাসী মনে করে, নাকি নপুংসক মনে করে — কে জানে? নীতিকথায় শরীর ভিজে? ক’দিন থিওরি বুঝিয়ে সামলাবেন এইসব?

যেই সমাজে বিয়ে কঠিন হয়, সেই সমাজে ব্যভিচার সস্তা হয়ে যায়। 

আমার এই লেখা কেউ পড়ুক না পড়ুক। আমি জানি এই ভয়াবহতা কত বেশি। একটা মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের হাল। যারা সংকীর্ণমনা নির্বোধ ইতর, তারাই কেবল এই কথার প্রতিবাদ করবে — চিন্তিত না হয়ে। কেননা, আপনি/আপনার সন্তান হয়ত সাময়িকভাবে মুক্ত (আমি বিশ্বাস করিনা, কেননা পদস্খলনে কয়েক মূহুর্ত লাগে), কিন্তু তারা যাদের সাথে চলে — অথবা এই সমাজেরই আরো অনেক ছেলেমেয়ে সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে চলেছে। নীতির কথা তাদের কাছে হাস্যকর। তারা আপনাদের ভেজে খাবে। আপনাদের চিন্তার অসারতার কারণেই তা হবে, হবেই। আমি হলফ করে বলতে পারি।

একটা ছেলে পাশ করে চাকরি করলেও হয়না। তাকে অনেএএএক টাকা ইনকাম করতে হবে। এই ছেলের সম্ভাব্য বউ ততদিনে কলেজ ভার্সিটিতে ডজনখানেক রোমিওর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বসে থাকে। এরপর ৩০বছর, ৩২ বছরে সবাই ছেলেটিকে বিয়ে দিতে অস্থির হবে — তখন তার চরিত্র কেমন আছে কে জানে, মেয়েটারটাও কে জানে। বিয়ের পবিত্র আবেগ বহু আগেই তাদের হারিয়ে ক্ষয়ে যায় — তা যে কেউ বুঝে। শারীরিক-মানসিক এই চাওয়া পূরণে তারা যে আগেই কোথাও সাময়িক ঢুঁ মারেনি তাইবা কে জানে?

মুর্খ অভিভাবকদের চোখে পড়েনা এখনকার ডিভোর্স রেট? চোখে পড়েনা সবখানে অশ্লীলতা দেখে? তার সন্তানটি কী ভাবছে মনে করেন তারা? বিয়ের বয়সটা ছাত্র জীবনে রাখলে কী সমস্যা হবে? দায়িত্ববোধ যার কখনই ছিলনা, তার কখনই হবেনা। ছেলের ও মেয়ের বাবা মা আরো কিছুদিন (বিয়ের পরেও) ভরণপোষনের দায়িত্ব নিলে কি সমস্যা? তাদের কি সন্তানের চরিত্রের চাইতে লোকে কি বলবে –সেটাই বড় বিষয়? এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অনেক অল্পতেই শারীরিক ব্যাপারগুলো ভালো করে বুঝে ফেলে। দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিয়ে সপাত্রে/সপাত্রীতে হস্তান্তর করে দিতে না পারলে ভুক্তভোগী পরিবারের হর্তাকর্তারাই হবে — হচ্ছে হরদম।

অথচ এসব ভাবার কেউ যেন নাই। একদিন পারিবারিক বন্ধনগুলো সব ধ্বংস হবে — তখন হয়ত টের পাবে। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা সঙ্গীন। প্রতিটি ছেলেমেয়েরই নৈতিক অবস্থা ভয়াবহ। এখানে এগিয়ে আসার কেউ নাই। আফসোস। সজ্ঞানে বিগত ৫-৭ বছর ধরে এসব দেখতে দেখতে আজকে প্রথম লেখলাম। না লিখে পারলামনা। এই চিন্তাগুলা প্রতিদিনই আমাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে।

যারা সবকিছুকে এড়িয়ে চলতে পারে — তারা এই লেখাকেও এড়াবে। আমি এই চিন্তাগুলোর বাস্তবতা খুব ভালো করে দেখছি। শত শত সমসাময়িক ছেলেমেয়েকে উদাহরণ হিসেবে জানি। হাজারখানেক ছেলেমেয়ের সার্কেলের ও কালচারাল ট্রেণ্ড জানি। অভিভাবকরা পদক্ষেপ না নিলে একটা ধ্বংস অবধারিত। যেহেতু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে ঠেকানোর উপায় নেই — পরিবারকে ঠেক দেয়াই এখনকার প্রথম কর্তব্য হওয়া উচিত। তাই বলছি, বিপদে যাবার আগে, সমাজকে ধ্বংস হতে দেবার আগে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে, নৈতিক শিক্ষা বলীয়ান করে সন্তানদের বিয়েকে এগিয়ে নিয়ে আসুন। ৩০-৩২ বয়েসে ছেলেদের, ২৫-৩০ বয়সে মেয়েদের বিয়ে না নিয়ে তাকে যথাক্রমে ২২-২৫ এবং ১৮-২২ বছরে নামিয়ে আনলে সামগ্রিক ক্ষতি নেই। অন্যথা? সাধু সাবধান!!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s