Category Archives: Social Problem

স্বগতোক্তিঃ পিপীলিকাদের মরে যাওয়াই ভাল

029d539cc497f10d2f0f6a7067005ff7

(নিচের মন্তুব্যটি সংগৃহীত। প্রথম আলোতে মন্তব্যটি লিখেছেন  আরমান) 

জন্মই যেন আমাদের আজন্ম পাপ, আর সেই পাপ মোচন করতেই অনেককেই পুড়ে অঙ্গারে হতে হয়, কংক্রিটের নিচে চাপা পরতে হয়। হত্যা, খুন, গুম ধর্ষণের বলি হয়েও আমরা অনেকেই পাপ মোচন করে থাকি। আমি দার্শনিক নই, অনুভব ও অনুভূতির ঊর্ধে র্খালি চোখে স্পষ্ট প্রতীয়মান – এই মৃত মানুগুলোর কি খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল? তারা কি উচ্চাভিলাসী? অবশ্যই না; শুধু মাত্র দু-বেলা খেয়ে বেঁচে থাকার নিরন্তন প্রচেষ্টার লড়াইয়ে তারা সৈনিক মাত্র। হল মার্কের ৪,০০০ কোটি টাকা, পদ্মা সেতু, শেয়ার বাজার বা অতি সম্প্রতি সোনালি ব্যাঙ্কের ১,৬০০ কোটি টাকা জালিয়াতির কোন খবরই সম্ভবত তাদের কাছে ছিল না। সিঙ্গাপুর থেকে তারেক বা কোকোর কত টাকা দেশে ফেরত আনা হয়েছে সেটাও এই বলি হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কাছে ভিত্তিহীন ছিল।

কত স্বপ্ন ও অনুভূতির মৃত্যু? ছোট ছেলেটা হয়ত তার বাবাকে বলেছিল রঙ্গিন একটা শার্ট কিনে দেবার জন্য, স্ত্রী হয়ত স্বামীকে বলেছিল যে আসার পথে বাজার থেকে ভাল কিছু মাছ কিনে আনার জন্য কারণ ছোট খুকি কয়েকদিন যাবত মাছ খাবার বায়না ধরেছে যে! কারো হয়তো কিছু দিন পরেই বিয়ের পিড়িতে বসার কথা, মেয়েটার মনে সে কি আনন্দ অনাগত সুখ-সমৃদ্ধ জীবনের কথা ভেবে! কারো অসুস্থ বাবা-মায়ের হয়তো ঔষধ শেষ হয়ে গিয়েছে, বাড়ি ফেরার পথে হয়তো তা নিয়ে আসবে তার উপার্জনক্ষম একমাত্র সন্তান!

এত নিষ্পাপ অনুভূতির মৃত্যুর ক্ষত কি রাষ্টীয় শোক দিবস পালন করলেই সেরে যাবে? মৃত মানুষচগুলো আর কোন দিন ফিরে আসবে না। আহত-নিহতদের চিকিতসা ও সাহায্য এখন অতীব প্রয়োজন যা কিনা রাষ্টীয় শোকের আতলামীর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবিলম্বে দ্বায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা না হলে আরো অনেক মৃত্যু আমাদের দেখতে হবে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানগুলোতে যে ভয়াবহ অবক্ষয় বিরাজমান তা দূর করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বছরের ৩৬৫ দিনকেই রাষ্টীয় শোক দিবস হিসেবে আমরা পাব।

Gratefulness

(Image source)

Summer has finally come to Qatar. Temperature is already notching 40 degree Celsius.

Every morning after I get down from my bus, I come across gardeners, who toil under the hot sun to maintain and improve the landscaping of our company buildings.

One morning, I confronted one of them. I ask him straight, “How much do you make brother?”

“600 Riyals.”

“600 Riyals?”

“Yes. 400 basic salary, 200 for food. Accommodation is provided.”

“Basic only 400?”

“Yes, the company keeps the basic salary low so that they can pay less overtime money per hour.”

Subhanallah! The blessing of creativity is being used for oppression and injustice.

I wanted to calculate how much they are paid for per hour of overtime.

400*1.25/(8*22.71429) = 2.43 Riyals.

For less than five riyals, they spend two more hours every day under the scorching sun. For 125 riyals per month, they spend an additional 51 hours under the sun!

When authorities are asked about their inhumane treatment of the workers, they defend themselves by saying, “These people were in far worse situation back in their countries. At least by working here, they can send some money back home and feed their family.”

What they say is true. But that does not mean that I should take advantage of someone’s problem.

To be honest, I believe that the company owners will be able to make ample profit even if they double the salary of these workers. But instead of forty thousand, the owners will have to be satisfied with a profit of twenty thousand riyals.

However, the owners are not prepared to be satisfied with a little less profit. They always want more. Greed has made their conscience numb and turned their hearts into stones. Therefore, earning rewards in the hereafter by helping other people do not cross into their mind anymore. The bottom line for them is always about making more money, and if making more requires taking advantage of someone’s poverty and enslaving them, they do not mind doing that either.

I move towards our maintenance building with a heavy heart.

Right in front of our maintenance building, I come across a Nepalese gardener. I am convinced from his facial appearance that he grew up in the mountains of Nepal. A son of the Himalayas. May be his childhood days were full of playing with snows.

But with time, everything changed. The Himalayan boy suddenly discovered himself working under the desert sun.

This is life. For some, life is a nightmare.

When I look at these people, I make a prayer for them. “O Allah! If these people are not guided, guide them to Islam.”

Sometimes I go to them and broach the subject of Islam. They only smile and continue their work.

(Image source)

(Image source)

While coming home, I come across similar but slightly different scenes. I see workers who have already finished their day’s work lying under the desert sun and waiting for their buses that would take them back to their camp.

Whether they work, eat lunch, take rest, or wait for their bus, they have to do it outdoor as companies do not provide any shaded areas for them.

But these under privileged people never cease to amaze me. I have learned so many things from them.

They are always quiet. They do not complain. I learned from them how to be patient and accept the qadar of Allah with humility and grace.

They are always sincere at work. Even though they do not have a boss hovering over them and are not blessed with high salary, phone breaks, and coffee breaks, they do not slack during their work. They work with zeal.  They taught me how to make money truly ‘halal’ and how to work with unquestionable integrity.

They have a natural simplicity that I do not have. I may not be arrogant, but I certainly do not have the frankness and the simplicity they possess. In fact, I will never possess simplicity like that of them. In the process of getting degrees and pursuing social status and such, my heart has become complicated and lost its simplicity forever.

When I look at these people and compare the blessings that I have been bestowed with that of theirs, I feel ashamed and hypocritical. I have not been adequately grateful to Allah. Period. Worse, I even show the audacity to commit sins without any second thought.

Sin is hypocrisy. Sin is ungratefulness. Hypocrisy and ungratefulness bring destruction.

Allah said in the Quran:

And He gave you of all that you asked for, and if you count the Blessings of Allah, never will you be able to count them. Verily! Man is indeed an extreme wrong-doer, – a disbeliever (an extreme ingrate, denies Allah’s Blessings by disbelief, and by worshipping others besides Allah, and by disobeying Allah and His Prophet Muhammad SAW). [The Noble Quran 14:34]

A meaning of the word ‘kufr’ is ungratefulness. A common trait of any disbeliever is He is ungrateful to Allah. He takes the blessings of Allah for granted.

If you have helped someone who took your help for granted and reciprocated you with ingratitude, you would know what an abhorrent trait ungratefulness is.

The Messenger of Allah (ﷺ) would stand in prayers for so long that his feet would swell. Aishah (رضى الله عنه) asked him one day, “O Messenger of Allah! Why are you doing this when Allah has forgiven your past and future sins?”

The Messenger of Allah (ﷺ) said, “O Aishah! Should I not be a grateful slave?”

What a wise and poignant answer!

Out of all humanity, Allah chose our Prophet to be His final Messenger. It was a great blessing and the Messenger of Allah (ﷺ) would thus always strive very hard to be the most grateful slave of Allah.

This should be our attitude too. Being Muslims, we simply cannot afford ungratefulness.

Recently there was an incident of favoritism in our office. Someone was promoted and my heart was restless over it. I was not able to focus in my salah.

My heart was ungrateful to Allah! I was being oblivious of Allah’s numerous blessings and was focusing on someone else’s blessing that he was destined for.

I looked outside the window of the mosque and saw the gardeners outdoor toiling under the sun.

My heart found tranquility. I could have been in one of their shoes, but it was the mercy of Allah that He decreed otherwise. This is the reason why the Messenger of Allah (ﷺ) advised us to look at those who are below us when it comes to social status, wealth, or worldly matters.

I swear by Allah, if Allah questions me only about the blessing of air condition on the Day of Judgment, and measure what I have done to show gratitude for this single blessing, I will fall short.

Allah commanded us to be grateful. Allah said:

Therefore remember Me (by praying, glorifying, etc.). I will remember you, and be grateful to Me (for My countless Favours on you) and never be ungrateful to Me. [The Noble Quran 2:152]

May Allah help us to strive hard and make us grateful slaves!

নির্মমতা

সেই শিশু কাল থেকে পড়ে আসছি, মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে প্রথমটিই হল খাদ্য। কারণ খাদ্য ছাড়া এই পৃথিবীর কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। বড়লোকের ছেলে-মেয়েদের যেমন ক্ষুধা লাগে, বস্তির ছেলে-মেয়েদেরও তেমন ক্ষুধাই লাগে। তেমনি ক্ষুধা লেগেছিল উপরের দুটি মেয়ে শিশুর। কিন্তু কেউ তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করে নি। বাধ্য হয়ে তারা খাবার চুরি করতে গিয়েছিল। কিন্তু ধরা পড়েছে। অভাগা যেদিকে তাকায়, সাগর শুকায়ে যায়। পেটের দায়ে চুরি করতে আসা চোরের উপর হাজী মুহম্মদ মহসিনের করুণা হয়েছিল। তিনি চোরকে তার পরিবারের খাবার কেনার জন্য টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু এই দুটি ক্ষুধার্ত, গরিব শিশুর জন্য করুণা করার একটি লোকও পাওয়া যায়নি। বরং তাদেরকে চুরির দায়ে মারার মত পাষণ্ড পাওয়া গেছে অনেক।

আমরা আজ খুব বেশি স্বার্থপর হয়ে গেছি। অন্যের জন্য চিন্তা করার একটা মুহূর্তও নেই। আমরা আজ সবাই শুধু নিজেকে নিয়ে চরম ব্যস্ত। এই গরিব দুঃস্থদের জন্য চিন্তা ভাবনা বড়োজোর ব্লগ, ফেসবুক, বা সংবাদপত্রের কলাম পর্যন্ত  সীমাবদ্ধ থাকে।

এই স্বার্থপরতাকেও আমি মাফ করতে পারতাম, যদি অন্তত আমাদের সমাজে এই দুটি গরিব শিশুর উপর হাত তুলতে পারে এরকম একজন পাষাণ মানুষও না দেখতাম।

কিন্তু  পাষণ্ডের অভাব হয়নি। বরং করুণা করার জন্য একটা মানুষও এগিয়ে আসেনি।  এগিয়ে যেহেতু আসেনি, তাই আমি আমাদের স্বার্থপরতাকে ক্ষমা করতে পারছি না।

আইয়্যামে জাহেলিয়াতের মত পাষাণ মানুষ নাকি আর হবে না। তবে আমার এই বাংলাদেশের মানুষের বর্বরতা দেখে মনে হয়, আমারা সম্ভত সেই বর্বরতার যুগকেও হার মানিয়েছি।

লিমনের কাটা পা (ছবিঃ প্রথম আলো)

আমরা সবাই স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। আর আমারা যারা বয়সে এখনো তরূণ, তাদের স্বপ্ন দেখার মাত্রাটা আরেকটু বেশি। আমার মত উপরের ছবির এই ছেলেটি, যার নাম লিমন, সেও স্বপ্ন দেখত। স্বপ্ন দেখত পড়াশোনা করে একদিন তার দুঃখী বাবা-মায়ের কষ্ট দূর করবে। স্বপ্ন দেখত একদিন সেও পড়াশোনা করে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়বে। তবে লিমনের স্বপ্ন আর কোনদিন পূরণ হবে না। কারণ র্যা ব নামক এক আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (নাকি হানাদার বাহিনী) কোন কারণ ছাড়াই লিমনের এক পায়ে গুলি করেছে । অপারেশন করে ডাক্তাররা লিমনের পা কেটে ফেলে দিয়েছেন। লিমনের আজ এক পা নেই। অনেক সময়ই বাস্তবতার আঘাতে আমাদের স্বপ্ন গুড়ো হয়ে যায়, কিন্তু আশার শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যায় না। সেই আলোটুকু থাকে বলেই আমরা বেঁচে থাকি এবং নতুন উদ্যমে শুরু করতে পারি। কিন্তু লিমনের সেই আলোটুকুও কেড়ে নেয়া হয়েছে। যেখানে আজ লিমনের একটি পা-ই নেই, সেখানে নতুন উদ্যমে শুরু করার প্রাণশক্তি কি লিমন ফিরে পেতে পারে? স্বপ্নবিহীনভাবে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। তবে লিমনের বেঁচে থাকতে হবে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৈরি করা হয় দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালনের জন্য। কিন্তু আমাদের দেশে টাকা পয়সা দিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে পোষা হয় মূলত শোষণের বিরুদ্ধে পিঠ ঠেকে যাওয়া জনগণকে ডান্ডাপেটা, এবং প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করার জন্য। এইসব লাঠালাঠি এবং ক্রস ফায়ারের অনেক সময়ই একটা দায়সারা ব্যাখ্যা দেয়া যায়, কিন্তু লিমনের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, সেটির কোন ব্যাখ্যা নেই। লিমনের সত্যবাদিতা নিয়ে আমি নিঃসংশয়; কারণ লিমনের চোখের পানি এবং সারল্যই তার সত্যবাদিতার প্রমাণ। যেহেতু কোন এনকাউন্টার হয়নি, সেখানে র্যা বের পুলিশ লিমনকে কী কারণে গুলি করল, তা আমি ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। লিমন নামে যদি কোন সন্ত্রাসী থেকেই থাকে, তাহলে ত অন্তত বিচার করে তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করা দরকার ছিল। নাকি এই ধরণের গুলি করা র্যা বের পুলিশদের খামখেলিয়াপনা?

এই সব প্রশ্নের জবাব জানতে ইচ্ছে করে, তবে যেটি আরো বেশি জানতে ইচ্ছে করে, সেটি হল র্যা বের সেই পুলিশটি কি মানুষ কিনা। তার যদি বিবেক বলে কিছু থাকে, তার ভেতর যদি মনুষ্যত্ব বলে কিছু থাকে, তাহলে সে কিভাবে একটি নির্দোষ মানুষের পায়ের উপর গুলি করতে পারল? তার ভেতরটা কি একটুও কাঁপল না?

এক ছোট শিশুর মৃত্যুর পর বিএনপির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বাবর সাহেব বক্তব্য দিয়েছিলেন, “আল্লাহর মাল আল্লাহয় নিয়ে গেছে”। বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা ম্যাডাম এখনো এই ঘটনায় বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পান নি। বেফাঁস কথা বলে বিপাকে পড়ার চেয়ে, বক্তব্য না দেয়াই উত্তম।

তবে হ্যাঁ, এই সব বক্তব্য দেয়া আর না দেয়া সমার্থক। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আশা দিয়েছেন যে দরকার হলে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। র্যা ব তাদের তদন্ত করছে। মানবাধিকার কমিশন তাদের কাজ করছে। সাংবাদিকেরা তাদের কলাম লিখছেন। আমি আমার দু’কলম লিখেছি। পাবলিক কিছু র্যা ব বিরোধী আওয়াজ দিচ্ছে।

কিন্তু লিমনের আশার শেষ আলোটি যেরকম মিলিয়ে গেছে, সেরকম কয়েকদিন পর শেষ হয়ে যাবে তদন্ত, সাংবাদিকদের কলমের কালি, ও পাবলিকের আস্ফালন। বন্ধ হয়ে যাবে বিচার বিভাগের নড়াচড়া এবং নিস্তেজ হয়ে পড়বে মানবাধিকার কমিশন। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ব আমার জীবন নিয়ে। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে সবার জীবন নিয়ে। জীবন চলতে থাকবে। তবে লিমনের জীবনটা চলবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

এক পায়ে জীবনটাকে বহন করা এমনিতেই হবে অনেক কষ্টের। কিন্তু জীবনের ভার ছাড়াও লিমন আজীবন বয়ে চলবে পা-হারানোর কষ্ট ও বেদনা নিয়ে। পা হারানোর এই অপূর্ণতা, এই শূণ্যতা এতই গভীর যে এই পৃথিবীর কোন কিছুই সেই অপূর্ণতা বা শূণ্যতাকে পূরণ করতে পারবে না। পা হারিয়ে লিমনে্র হৃদয়ে যে ছিদ্র হয়েছে, এই পৃথিবীর সমস্ত ভালবাসাও সেই ছিদ্র বন্ধ করতে পারবে না।

***

মাঝে মাঝে সুপারম্যান হতে ইচ্ছে করে। কোথাও কোন জুলুম দেখলেই যাতে প্রতিরোধ করতে পারি। কিন্তু আমি কোন সুপারম্যান নই। আমি একটা কাপুরুষ। দুটি গরিব শিশুকে বলার কোন ভাষা আমার নেই। কোন ভাষা এই বর্বরতার জবাব দিতে পারে না। পাশাপাশি কোন ভাষা ও ভালোবাসাও  আজ লিমন এবং লিমনের মা-বাবাকে একটু স্বস্তি দিয়ে পারবে না।  তবে আল্লাহ এবং শেষ  বিচারের দিনের উপর যারা বিশ্বাস রাখে, তারা নিশ্চিত থাকুনঃ আমাদের রব আল্লাহ সেই দিন কড়ায়-গণ্ডায় এই সকল জলুমের সম্পূর্ণ ন্যায় বিচার করবেন।

ইভ টিজিং কিভাবে বন্ধ হবে?

Eve Teasing

[বিঃদ্রঃ এটি আমার অনেক পুরনো লেখা। আমার সব লেখাকে একটি ব্লগে আর্কাইভ করতে চাচ্ছি, এই উদ্দেশ্যেই কেবল লেখাটিকে এখানে ছাপানো হল।]

বাংলাদেশে ইদানিং ইভটিজিং এর প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন সম্মানিত শিক্ষক এবং একজন মা প্রাণ দিয়েছেন। এই ব্যাধি কিভাবে নিরাময় করা যায়, সে ব্যাপারেও বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, মনের আধুনিকায়ন ও উদারতা বৃদ্ধি সহ আরো অনেক প্রস্তাব । আইন-শৃংখলা কঠোর করার প্রস্তাবও রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, ইসলামী মূল্যবোধ প্রচারের মাধ্যমে যে এই অসুখ সারানো যায়, তা কেউ আলোচনা করেননি। মনে হয় কেউ ভেবেও দেখেননি। তাইএই মহান বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি আল্লাহ এবং বিশ্বনবী মুহাম্মদ (স) এর বাণী ও কাজের কথা একবারও কেউ বলেন নি। ব্যাপারটা দুঃখজনক, কিন্তু আমার কাছে মোটেও বিস্ময়কর মনে হয়নি। কারণঃ

• একঃ প্রভু প্রদত্ত জীবন বিধান ইসলাম সম্পর্কে আমাদের সঠিক জ্ঞানের অভাব।

• দুইঃ আমাদের বর্তমান আলেম সমাজের কাজের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপনের অভাব।

• তিনঃ “আমাদের মা-বোনেরা পর্দা করে, আপনারা করেন না ক্যান? রাস্তায় মাইয়া মানুষ এইভাবে বাইর হলে এই রকম হবেই”- অনেক ইভটিজারের কাছ থেকে এ বক্তব্য শোনার পর স্বভাবতই যারা পর্দা করেন না, তাদের ভেতর ইসলাম সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা গড়ে ওঠে।

ব্যাপারগুলি এবার খতিয়ে দেখা যাক। খতিয়ে দেখার আগে আমি একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই যে, আমার এ আলোচনা পর্দা বিষয়ক নয়। পর্দা সম্পর্কে অন্য আলোচনা হতে পারে।

আসল কথাটা প্রথমেই বলে ফেলিঃ ইভটিজিং বন্ধের সবচেয়ে প্রধান উপায় হল আল্লাহকে ভয় করা। আল্লাহ যখন মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তখন মানুষের ভেতর সু (রূহ) এবং কু (নফস) নামের দুটি ভিন্ন সত্তা সৃষ্টি করেছেন। তারপর মানুষের মধ্যে আল্লাহ বিভিন্ন প্রবৃত্তি সৃষ্টি করেছেন। এই প্রবৃত্তি শাশ্বত, এবং তা অস্বীকারের কোন উপায় নেই। কিন্তু এই প্রবৃত্তিই শেষ কথা নয়। আসল কথা হল প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ (সু বা কু) এবং বিকাশপথ। যেমন ধরা যাক, সব মানুষই সম্পদ গড়তে চায়। কেন চায়? এটা আমাদের একটা প্রবৃত্তি। যেহেতু প্রবৃত্তি থাকা দোষের কিছু নয়, তাই প্রবৃত্তি ত পূরণ করতেই হবে। কিন্তু এই প্রবৃত্তির পূরণ তথা প্রবৃত্তির প্রকাশটা যেন সঠিক পথে হয়। টাকা-পয়সা অর্জন করছি ঠিক আছে, কিন্তু সেটা যেন বৈধ পথে হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে পথে বলেছেন, সে পথে যেন হয়। অবৈধ পথে যেন না হয়। সুদ, ঘুষ, চুরি বা ছিনতাইয়ের মাধ্যমে যেন না হয়। এই প্রবৃত্তির সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও সুন্দর প্রকাশই এ পৃথিবীতে মানুষের চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হবে, আল্লাহ তাদের পরকালে পুরস্কৃত করবেন। যারা অনুত্তীর্ণ হবে, তাদের আল্লাহ তিরস্কৃত করবেন এবং কঠোর শাস্তি দিবেন।

এই যে ইভটিজিং নামক সামাজিক সমস্যা, এটা কিন্তু পুরুষদের একটা প্রবৃত্তির বিকৃত ও অসুন্দর প্রকাশ।  আমরা সবাই প্রবৃত্তির সুস্থ এবং সুন্দর প্রকাশ চাই। আর সে সুন্দর প্রকাশের জন্য আমরা আজ শিক্ষা, আধুনিকায়ন, এবং মনের উদারতা সহ আরো আনেক কথা বলছি। কিন্তু কোন কিছুই প্রত্যাশিত ফলাফল আনছে না। আমাদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া ছাত্ররা ইভটিজিং এর বেলায় এক ধাপ এগিয়ে। সমাজ গড়ার কারিগড় শিক্ষক এবং সমাজের রক্ষক পুলিশও আজকাল যৌন হয়রানি করে। আজকাল মোবাইল ফোনে ছেলেরা যত্র-তত্র নগ্ন ছবি রেকর্ড করছে। আমি শিক্ষা, আধুনিকায়ন, মনের উদারতা, এসবের বিরোধিতা করছি না; বলছি না যে এগুলোর দরকার নেই। কিন্তু মানুষের প্রবৃত্তি নামক জিনিসটা এতই শক্তিশালী, যে এই প্রবৃত্তির সঠিক নিয়ন্ত্রণ হতে পারে কেবল আল্লাহকে ভয় করে তাঁর এবং তাঁর রাসূলের আদেশ নিষেধ মেনে চললে।

এবার দেখা যাক, ইভটিজিং রক্ষায় ইসলাম কী বলেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেনঃ

“বিশ্বাসী পুরুষদেরকে তাদের দৃষ্টি নত রাখতে এবং শিষ্ট হতে বল। এটা তাদের জন্য পবিত্র। তারা কী করছে, আল্লাহ সে ব্যাপারে অবহিত। এবং বিশ্বাসী নারীদেরও তাদের দৃষ্টি নত রাখতে এবং শিষ্ট হতে বল ।“ (সুরা নুরঃ ৩০-৩১)

রাসুলাল্লাহ (স) বলেছেন, “চক্ষুও ব্যাভিচার করতে পারে। আর চোখের ব্যাভিচার হল দৃষ্টিপাত (পর নারী বা পুরুষের প্রতি)”

রাসুলাল্লাহ (স) আলী (র) কে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, “হে আলী! কোন পর-নারীর উপর একবার দৃষ্টিপাত হয়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করবে না। প্রথমবার দৃষ্টিপাত ভুলবশত, তাই ক্ষমার্হ, আর দ্বিতীয়বার হল ইছাকৃত।”

একজন মহিলা পুরুষের সামনে দিয়ে গেলে, শয়তান পুরুষকে প্রলুব্ধ করে দৃষ্টিপাত করার জন্য। শয়তানের এই প্রলুব্ধতা থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু অজেয় প্রতিসম এই কাজকেও জয় করা সম্ভব একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসুলের সতর্কবানী স্মরণ করে। রাসুল (স) বলেছেন, “এভাবে দৃষ্টিনত করা কষ্টকর হতে পারে, কিন্তু যে দৃষ্টিনত করবে, অন্তরে সে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করবে।“

রাসূলাল্লাহ (স) আরো বলেছেন, “এ পৃথিবী মিষ্টি ও সবুজ, এবং আল্লাহ তোমাদের কর্মের উপর দৃষ্টি রাখছেন। সুতরাং, তোমরা পৃথিবী আর নারীদের ব্যাপারে ভয় কর, কেননা বনী ইসরাঈলের প্রথম বিচার হয়েছিল নারীদের ব্যাপারে।“

ত ভাইয়েরা আমার, যেখানে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল কেবল চাহনির উপরই এত কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে ইভটিজিং তো কল্পনাও করা যায় না। আর আমাদের কিছু লোকজন ইভটিজিং করে আবার হয়রানির শিকার নারীদের হুঙ্কার দিয়ে বলে, “পর্দা না করলে এ ধরণের গুতা ত খাইতেই হইব”। ভাবখানা এরকম, যেন কেউ পর্দা না করলেই ইভটিজিং ধর্মীয় বৈধতা লাভ করে। এই ধরণের ধৃষ্টতা যারা প্রদর্শন করে, আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে তাদের ভয় থাকা উচিত। কারণ, প্রথমত তারা ইভটিজিং করে আল্লাহর বিধান ভংগ করছে। দ্বিতীয়ত, তারা বলতে চায় যে পর্দা না করলে ইভটিজিং করতে কোন ধর্মীয় বাধা নেই, যা সম্পূর্ণ ভুল, মনগড়া এবং তাদের এই ধৃষ্টতা ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ও ভ্রান্ত মনোভাব সৃষ্টিতে ভুমিকা রাখে।

ইভটিজিং রক্ষার ব্যাপারে আমাদের আলেম সমাজ কী করছেন? উনারা কাজের মাধ্যমে কী দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন সাধারণ মানুষের জন্য? আলেম সমাজের দায়িত্ব হল মানুষকে ইসলামী জ্ঞান দানের পাশাপাশি তাঁদের কর্মে তার প্রতিফলন ঘটিয়ে দেখানো। ঢালাওভাবে বিচার করতে চাই না, কিন্তু আজকাল বেশির ভাগ আলেমের কাজেকর্মেই ইসলামে বাস্তবায়ন নেই । আলেম সমাজ আজকাল ইসলামের মূল শিক্ষাগুলোকে কর্মে পরিণত করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন না। অনেকেই থাকেন খালি একের অধিক বিবাহ এবং টাকা কামানোর ধান্ধায়। ইঞ্জিনিরাং পড়ে কেউ যদি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাক্টিস না করে, সে ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার কী কোন দাম আছে? নাই। তেমনি ইসমালের জ্ঞান অর্জন করে কেউ যদি সে জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ না করে, সেই ইসলামি জ্ঞানের আর কোন কানাকড়ি মূল্যও থাকে না। প্রয়োগবিহীন সেই জ্ঞান পরকালে মুক্তি লাভের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে না, উল্টো জাহান্নামে যাওয়ার সার্টিফিকেট হিসেবে কাজ করবে।  আলেম সমাজের এই অবস্থা হলে সাধারন মানুষ কার কাছ থেকে শিখবে? তাই আলেম সমাজকে বলছি,  মূর্তি ভাঙ্গার জিগির (আমি বলছি না যে মূর্তি থাকা উচিত, পূজ়া করি আর না করি, সত্যিকার একজন মুসলমানের অন্তরে যেকোন ধরণের মূর্তির প্রতি কোন ধরণের সহানুভুতি থাকতে পারে না; বাংলাদেশের মাটিতেও কোন মূর্তি রাখার পক্ষে আমি নই, হোক সেই মূর্তি অপরাজেয় বাংলা) তোলার আগে প্রথমে আগে নিজেদের সকল কাজ-কর্ম, আচার ব্যবহারে ইসলামের ও আল্লাহর নবীর সুন্নাতের প্রকাশ ঘটিয়ে মানুষকে ইসলামের বিধানাবলি অনুসরণের সুবিধা ও উপকার সম্পর্কে অবগত করুণ। ভন্ডামির রাজনীতি থেকে দূরে সরে আসুন এবং ধর্মকে দুনিয়া কামানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করুণ। দুনিয়া কামানোর নিয়তে ‘দেশ থেকে ইসলাম গেল’ আওয়াজ তুলে ভণ্ডামির রাজনীতি করলে মানুষ আর ইসলামের পথে আসবে না; উলটো ইসলাম মানুষের অন্তর থেকে দূরে সরে যাবে। যেমন যাচ্ছে বর্তমান সময়ে। কারণ পাগলেও ভণ্ডামি বুঝে। দেশের ইসলামের খবরদারির বদলে যদি প্রতিটি আলেম নিজের জীবনে ইসলাম আছে কিনা তার খবরদারি করতেন, আমাদের সমাজের মানুষ ইসলামে থেকে এত দূরে সরে যেত না। বরং আলেমদের কাজ কর্ম দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁদের কাছে আসত।

আরো তিনটি ব্যাপার ইভটিজিং এর আলোচনায় দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি রাখেঃ শিষ্টতা, উদারতা, এবং অশ্লীলতা। ইভটিজিং এক ধরণের অশিষ্ট, অমার্জিত, এবং সর্বোপরি অসভ্য আচরণ যার সম্পর্কে সূরা নূরে আল্লাহ আলোকপাত করেছেন। আর আমাদের কী কোন বিবেক নেই? বিবেক থেকে কী আমরা বুঝতে পারি না কোনটা মার্জিত আর কোনটা অমার্জিত? কোনটা শিষ্ট আর কোনটা অশিষ্ট?

আজকাল আমাদের সমাজের ‘আধুনিক’ লোকজনেরা প্রায়ই বলে থাকেন, মানুষের মনের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্কীর্ণতা হল ইভটিজিং এর অন্যতম কারণ। আমার প্রশ্ন হল মনের উদারতা বা সঙ্কীর্ণতার মানদণ্ড কী? পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুসরণ উদারতা আর ইসলামের অনুসরণ কী সঙ্কীর্ণতা? প্রকৃতপক্ষে আমরা আজ এমন এক কঠিন সময়ে বসবাস করছি, যেখানে কর্মক্ষেত্র, যানবাহন থেকে শুরু করে সর্বত্রই বিদ্যমান নারী ও পুরুষের সহাবস্থান। এই সহাবস্থান ইসলাম কর্তৃক একদমই সমর্থিত নয়। কিন্তু আমরা পুরুষরা যারা ইসলামের পথে চলতে চাই, যারা নারীদের সম্মান করতে চাই, যারা আমাদের প্রভুর নির্দেশ মেনে চলতে চাই, তারা এই পরিস্থিতিকে পরীক্ষা বা “trial” হিসেবে নিতে হবে। আরেকজনের উপর দোষ চাপানোর আগে দেখতে হবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি কিনা। তাই কোন মহিলা কি কাপড়-চোপড়ে বের হল, সেটা ত আমার দেখার বিষয় নয়, আমার দেখার বিষয় হল যে আমি দৃষ্টি নত করছি কিনা। কারণ এটা আমার আয়ত্তাধীন এবং আমার আয়ত্তাধীন বিষয়েই আমাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। আমার আয়ত্তাধীন বিষয় হল আমার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে দৃষ্টিনত করতেই হবে, তা যত কষ্টই হোক না কেন। মনে রাখতে হবে, এই দৃষ্টিনত করণ মনের সঙ্কীর্ণতা থেকে নয়, মনের উদারতা ও নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ইচ্ছা থেকেই। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আর তিনিই মানুষের ‘ফিতরাত’ বা স্বভাব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। সেই মহান প্রভু যেখানে আমাদের দৃষ্টিনত করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সেই নির্দেশ পালনকে কোন অর্থেই “মনের অনুদারতা” বলে আখ্যায়িত করা যায় না।

যে সকল প্রগতিবাদীরা, মানে বাংলাদেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ, কবি-নাট্যকার-গায়ক-বাদক-শিল্পী ও নৃত্যকারের সমাজ, যারা ইসলামকে মধ্যযুগীয় পন্থা বলে প্রতিনিয়ত কলাম লেখেন, যারা প্রতিনিয়ত বলে থাকেন যে অন্য সকল ধর্মের মত ইসলাম ধর্মও মানুষের সৃষ্টি, তাদের কে আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, “আপনারা দ্বিমুখী”। সোজা সাপটা ইংরেজীতে যাকে বলে “You guys are outright hypocrite”। কারণটা জানেন? কারণ আপ্নারা জোর গলায় বলতে থাকেন, মানুষ শিক্ষিত হলে সম্পূর্ণ যৌন-অনুভুতিবিহীন নারী-পুরুষ সহাবস্থান সম্ভব। আপনাদের মতে অন্তর ঠিক থাকলে মধ্যযুগীয় দৃষ্টিনতকরণের মত ঝামেলা নিষ্প্রয়োজন। এই ধরণের খোঁড়া যুক্তি আপনারা দিয়ে থাকেন কারণ আপনারা নিজেদের সাথে লুকোচুরি খেলেন। তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার, মানুষ কিন্তু কেবল নিজেকেই ফাঁকি দেয়, আর কাঊকে সে ফাঁকি দিতে পারে না। আল্লাহকে ফাঁকি দেয়া ত দূরের কথা। এই ধরণের ফাঁকিবাজির উদাহরণ নিজের জীবন থেকেই দেখেছি। যে দোকানদার আমার সাথে ভাল ব্যবহার করে নি, তাকেই দেখেছি কিছুক্ষণ পর এক সুশ্রী নারী ক্রেতার সাথে ফেরেশতার মত ব্যবহার করতে। ড্রাইভিং স্কুলের মহামান্য ইন্সট্রাকটরবৃন্দ পুরুষ শিক্ষার্থীদের সাথে এমন ব্যবহার করত, মনে হত মায়ের গর্ভ থেকে ড্রাইভিং না শিখে অপরাধ করে ফেলেছি। সেখানে নারী শিক্ষার্থীদের, মাশাল্লাহ, একঘণ্টার জায়গার দুই-ঘণ্টা শেখাতে চাইত।  অফিসের কোন বড় কর্তা যখন একজন নারীকে তাঁর সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন, তাঁকে যদি আমি জিজ্ঞেস করিঃ

আমিঃ পুরুষের বদলে নারীকে কেন নিয়োগ দিলেন?

কর্তাঃ আপনি কি তার সেক্রেটারিয়াল দক্ষতার কথা জানেন?

আমিঃ জানি না, শুধু জানি যে আপনি নিজের সাথে ফাঁকিবাজি করছেন। নিজের সাথে ফাঁকিবাজি করতে হলে জাগ্রত থেকেও ঘুমের ভান করতে হয়।

কর্তাঃ আপনি কি বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।

আমিঃ তাহলে বুঝায়ে বলি। আমি শুধু বলতে চাই যে আপনি প্রবৃত্তির দাসত্ব করছেন। আপনার এই দাসত্ব কোন লেভেলে আছে জানি না, তবে লেভেল জিরোতে থাকলেও শয়তান ঠিকই আস্তে আস্তে লেভেল ডিঙ্গাতে সহায়তা করবে।

কর্তাঃ কি অসভ্য, uncultured লোকের মত কথা বলছেন?

আমিঃ আমি অসভ্যের মত কথা বলছি না, সত্য কথা বলছি। সত্য মধুর হয় না, তিতা হয়।

কর্তাঃ আপনার মন কি এত নিচু? এত সংকীর্ণ মনের আপনি? মন এবং অন্তর ঠিক থাকলেই হল।

আমিঃ কেন, আপনার মন এবং অন্তর কি আল্লাহর রাসূলের চেয়েও উদার এবং কলুষমুক্ত?

কর্তাঃ কেন, আল্লাহর নবী কি বলেছেন?

আমিঃ আপনি জানেন কীনা জানি না, আল্লাহ তাঁর রাসুল মুহাম্মদ (স)  এর অন্তর তিনবার ফেরেশতা জিব্রাঈলের (আ) এর মাধমে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। রাসূলের অন্তর থেকে সর্বপ্রকার কু দূর করে সেখানে বিশুদ্ধ ঈমান ও জ্ঞান দিয়ে পূর্ণ করে দিয়েছেন। সেই রাসুল কোন দিন কোন পর নারীর দিকে তাকান নি। সেই রাসূল একদিন তাঁর সাহাবাদের জিজ্ঞাস করেছেনঃ “আমার চেয়ে কলুষমুক্ত অন্তর কী তোমাদের কারো আছে?” সাহাবারা বললেন, “না”। তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, “তবে জেনে রাখো, আমিই কোন পর-নারীর সাথে করমর্দন করি না।”

কর্তাঃ বুঝলাম, কিন্তু মোল্লারা ত দেখলাম দৃষ্টি নত করে না?

আমিঃ আল্লাহ কি বলেছেন যে মোল্লা হলেই বিনা বিচারে এক দৌড়ে জান্নাত চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিবেন? মোল্লাদের বিচার ত হবে সবার আগে এবং তাদের বিচার হবে সবচেয়ে কঠিন। আর আরেক জনের ব্যর্থতা ত আপনার ব্যর্থতার অজহাত হতে পারে না।

কর্তাঃ ধর্ম ত ব্যক্তিগত বিষয়, আপনি কেন আমাকে জ্বালাতন করছেন?

আমিঃ ব্যক্তিগত বিষয়, তবে আল্লাহর রাসূল আমাদের বলেছেন ইসলামী জ্ঞানের কথা একজন থেকে আরেকজনের কাছে জানানোর জন্য। নিউটন যদি তাঁর গবেষণার কথা কাউকে না জানাতেন, তাহলে আজকে আপনি নিউটনের সূত্র জানতেন না।

কর্তাঃ আপনি কি তালেবান? মেয়েরা তাহলে কি করবে? ঘরে বসে থাকবে? পড়াশোনা করবে না?

আমিঃ আমি তালেবান না, এবং মেয়েদের পড়াশোনা অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু সহাবস্থান এর সুরাহা করতে হবে।

কর্তাঃ ইসলাম ১৪০০ বছর আগে নিয়ম। এই নিয়ম সংস্কার করার প্রয়োজন আছে।

আমিঃ প্রয়োজন নাই, কিন্তু আপনার অবৈধ ভাবে প্রবৃত্তির সুযোগকে বৈধ করতে চান, তাহলেই কেবল এ ধরণের সংস্কারের কথা আসে।

আর কোন প্রগতিবাদীকে দৃষ্টিনতকরণকে মনের অনুদরতা বললেই বা কী, মানুষের সকল কাজের বিচার হবে তার অন্তরের নিয়্যাতের বা intention উপর ভিত্তি করে। পর্দা বিহীন কোন পর- মহিলার দিকে ১০০% কলুষমুক্ত দৃষ্টিপাত এককথায় অসম্ভব। সে কারণে আল্লাহর রাসুল কখনো পর-নারীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করতেন না। আর আজকাল আমাদের সমাজে, বিশেষ করে চাকুরীক্ষেত্রে অহরহ পাশ্চাত্যের অনুকরণে নারী-পুরুষের করমর্দন বা হ্যান্ডশেকও প্রচলিত হয়ে যাচ্ছে। এ কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হল, পাশ্চাত্যের open culture অনুকরণের মাধ্যমে ইভটিজিং বন্ধ বা কমতে পারে না, কেবল বাড়তেই পারে।

আর প্রতিটি মুসলমানের “ফাহশা” বা অশ্লীলতা সম্পর্কে প্রচণ্ড সচেতন থাকা উচিত। এই ইভটিজিংকে আমি বলব এক ধরণের অশ্লীলতাও। শয়তানের কুমন্ত্রণায় অশ্লীলতা আজকাল এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, এটাকে এক ধরনের মানসিক বিকার বা অসুস্থতা বলা যেতে পারে। তাছাড়া অশ্লীলতার আরেকটি কুফল হল অশ্লীলতার সাথে জড়িতদের “self-esteem” ও “confidence” হ্রাস পাওয়া, যা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত। আমরা যদি অশ্লীলতা বন্ধ করতে না পারি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম হবে “self-esteem” ও “confidence” বিহীন, যার পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ অনেকবার আমাদের এ সম্পর্কে সচেতন ও সাবধান করেছেন । কিন্তু আমরা আজ ইসলাম থেকে অনেক দূরে। তাই আল্লাহর এই সতর্কবানী আমাদের এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে যায়। অন্তরে কোন রেখাপাত করে না। আমাদের রাসূল (স)ও সাহাবী (র) রা যখন কুরআন তেলাওয়াত করতেন, তখন আল্লাহর কোন সতর্কবানী তেলাওয়াতের সাথে সাথে উনাদের অশ্রু ঝরত। কারণ আল্লাহর একটা আদেশ তাদের মনে এমনভাবে রেখাপাত করত, যে আল্লাহর প্রতিটি নির্দশকে তাঁদের কাছে পিঠের উপর সাক্ষাত বেত্রাঘাত স্বরূপ মনে হত।কিন্তু আফসোস, আমাদের মাঝে সেই আল্লাহ ভীতির আর কোন ছিঁটেফোঁটাও অবশিষ্ট নাই।

ত ভাইয়েরা আমার, আসুন আজ থেকেই কঠোর কণ্ঠে না বলি ইভটিজিংকে। সকল অসুন্দর, অশিষ্টতা, বিকৃত রুচিকে মন থেকে ঘৃণা করি। প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য অনুধাবন করি আল্লাহ ও তার রাসূলের পবিত্র বাণীকে। অনুধাবন করি ইভটিজিং করার কারণে পরকালের ভয়াবহ শাস্তিকে। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সকলকে তোমার জীবন বিধান ও তোমার রাসূলের দেখানো পথে চলার তওফীক দান কর। আমীন!