Tag Archives: dialect

কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষার কিছু ক্লাসিক ডায়ালগ

 

map_commillaবাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলারই রয়েছে স্বকীয় আঞ্চলিক ভাষা। আঞ্চলিক ভাষার রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। কোন একটি অঞ্চল ও সেই এলাকার মানুষকে ভাল মত বুঝতে হলে সেই এলাকার আঞ্চলিক ভাষাটিও বুঝতে হয়। আমি কুমিল্লার মানুষ। এবারের দেশের ছুটিতে গিয়ে দেশের মানুষের ভাষা মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। সেই শোনা থেকে কিছু কথা নিচে তুলে ধরলাম, যেগুলোকে আমার মনে হয়েছে কুমিল্লার ক্লাসিক ডায়ালগ।

 
০১.
আমাদের বাড়ির ঊঠোনে মাটি ফালানোর জন্য গ্রামের কয়েকজন এসেছিলেন। এদের একজন আমাকে বলছিলঃ

“তোমার বুজি এনা আমগোরে চিনে, আমগোরে দেখলে অনে হ্যাঁক্যাইলোইলে, অই চোরেরা, তোরা কই যাস?”

 
০২.
একটা সদাই আনার জন্য গ্রামের বাজারে যাচ্ছিলাম এক বিকেলে। সড়কের মোড়ে শোনলাম এক যুবক আরেকজনকে বলছেঃ

“ওই, তুই বলে জেসমিনরে বিয়া করবি?”

 

০৩.
বাঞ্ছারামপুর বেড়াতে গিয়েছিলাম আমার দূর সম্পর্কের এক নানার বাড়িতে। নানার এক সৎ ভাই নানার জমিগুলো চাষবাস করেন। জমিতে শীতের প্রায় সব শাক-সবজি ছিল। বিশাল ক্ষেতের এক জায়গায় দেখলাম কিছুই নেই। জিজ্ঞেস করলাম, “নানা, এই জায়গাটা খালি কেন?” নানা বললেনঃ

“বান্যাইছিলাম, অয় নাই।”

 
০৪.
জুমুয়ার নামাযের সালাম ফিরালেন ইমাম সাহেব। সেদিন পেছনের সারিতে মাদ্রাসার ছোট ছাত্ররা খুব আওয়াজ করছিল নামাযের সময়। নামাযের সময় তাদের এই দুষ্টুমিতে বিরক্ত বয়স্ক মিজান সাহেব হেঁকিয়ে উঠলেনঃ

“আমি কি নামাযের সময় হুজুরের ক্বিরাত হুনমু, নাকি ছুইটক্যাগর আওয়াজ হুনমু? এই ছুইটক্যাগুলিরে মসজিদে না আনলে হয় না?”

 
০৫.
আমাদের বাড়িতে দেয়ালে প্লাস্টারের কাজ করছিল দুই রাজমিস্ত্রী। তাদের কথোপকথনের একাংশঃ

প্রথমজনঃ হে যেই দেমাক দেখাইত!
দ্বিতীয়জনঃ কাইজ্যা লাগলে কইত-তোর মাথাত যেতলা চুল, আমার এর চেয়ে বেশি ট্যাকা…
প্রথমজনঃ অহন নাই, গ্যাছে গা সব…
দ্বিতীয়জনঃ শুনছি খালি দুইটা পুত আসে সিঙ্গাপুর
প্রথমজনঃ নামে আসে, কামে নাই
দ্বিতীয়জনঃ একটা আইসে হেদিন দেশে। জিগাইলাম, কি আনসোস? কয় মামা, খালি জানডা লয়া আইসি, কিচ্ছু আনি নাই”

 
০৬.
উপজেলা শহর হোমনায় বাজার করতে গেছি একদিন। হঠাৎ এক রিকশার চাকার সাথে আরেক রিকশার চাকার সংঘর্ষ লাগল। পাশের আরেক রিকশাওয়ালা চেঁচিয়ে উঠলঃ

“ক্ষ্যাপাজ্যাপা কইরা রিকশাডা লাগায়া দিছে, ড্রেইভার হইসে রে, ড্রেইভার হইসে!”

 
০৭.
বালু আর মাটি সরানোর কাজ করছিল দুই শ্রমিক। তাদের মধ্যকার কথোপকথনঃ

প্রথমজনঃ কি মারস?
দ্বিতীয়জনঃ চ্যালা।
প্রথমজনঃ মারস কিত্তি, ইডি কামড়ায় না।
দ্বিতীয়জনঃ কোনডি কামড়ায়?
প্রথমজনঃ যেডি পুটকি উপরের দিক দিয়া হাঁডে!

 
০৮.
বাজারে টমেটো বিক্রি করছিল এক সবজিওয়ালা। এক ক্রেতা হাঁকালোঃ

“বাগুন কত?”
“তিরিশ”
“আরে কমান না?”
“এক দাম তিরিশ। আরে নিয়া দেহেন না বাই, মুখের মইধ্যে দিলে মোমের মত গইল্যা যাইবোগা”

 

০৯.
এক শাঁক বিক্রেতা আমার আব্বুকে দেখে বলে ওঠলোঃ

“ভাই, এক দিনও শাঁক বেঁচতে পারলাম না আপনের কাছে।”
“বাসায় খাওয়ার মানুষ নাই, কেউ খায় না।”
“না খাইলে জোর কইরা খাওয়াইবেন।”

 
১০.
নিচের কথাগুলো আমার দাদির। দাদির বয়স ৮২ বছর। দাদির মনে জমা আছে এই সুদীর্ঘ জীবনের রাজ্যের গল্প। একবার গল্প শুরু করলে, গল্প আর শেষ হয়না। কষ্ট হলেও অনেক গুল্প শুনেছি দাদির। সেই সব গল্পের কিছু অংশঃ

“আমার হেই ছোড পোলাডার চোখগুলি আসিল ডাঙ্গর। আর শইল্যের রঙডা আছিল দুধের মত, ছাই দিয়া খেললেও কালি লাগত না শইল্যের মইধ্যে। জরা বানায়া ভাত খাইত, এক জরা খাইত, আর এক জরা কাউয়ারে দিত।”

“তোর দাদায় যেদিন মরছে, হেদিন খাওয়াইয়া ফোতায় দিসি। কিছুক্ষণ পরে দেহি আর কতা কয় না।”

“মিসা কতা কেরে কমু, হেসা হেসা কতা কমু।”

“কম খাইলে নি রিজিকটা থাহে।”

“আমি জবর কস্ট করসি আমার বাপের বাইত, আমি সম্পত্তি না আনলে হালাল হইব না।”

“পানি ভাত লৈইয়া কাইজ্যা করত আমার পোলা-মাইয়ারা। সৈ সান দা পানি ভাত খাইতো।”

“পোলায় এনা মারে ফালায় দে, মায় কি পোলারে ফালায় তারে?”

“তোমার দাদায় যে হাউস কইরা বিয়া করছিল, সারাডা জীবন এই হাউসডা আসিল। আমারে সব সময় তুমি কইরা কইসে।”

“আমার দান-খরায়তের কথা তোমগরে কি কমু, কেউ যদি আমার কাছে কিছু চায়, কোম্বালা হেই জিনিসটা হেরে দিমু,খালি হেই চিন্তাডা মাথাত ঘুরে। আগে মাইনষেরে যে দেওয়া দিসি, সেই গন্ধেই ত মানুষ এহনো আইয়ে আমার কাছে। কিন্তু এহন কি আর দিতারমু? সংসার চালায় পুতের বউ।”